kalerkantho


‘সমৃদ্ধি’ মডেলে পাল্টে যাচ্ছে ৪৩ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা

আরিফুর রহমান   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘সমৃদ্ধি’ মডেলে পাল্টে যাচ্ছে ৪৩ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা

ক্ষুদ্রঋণের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে দেশে অনেক বিতর্ক আছে। কারো মতে, দারিদ্র্যবিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আবার কারো কারো মতে, ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্যবিমোচন তো করছেই না, উল্টো অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার বিলকিস বেগম নদীভাঙা এক সংগ্রামী নারী। কয়েক দফা নদীভাঙনের শিকার হয়ে হাতিয়ায় নতুন করে জেগে ওঠা চর এলাহী ইউনিয়নে বসবাস করছেন। বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বসবাস করায় দরিদ্র বিলকিসের কাছে ক্ষুদ্রঋণের প্রস্তাব নিয়ে কেউ যায়নি। তবে সরকারের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ‘সমৃদ্ধি’ কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে অতি দারিদ্র্যের তালিকা থেকে বেরিয়ে এসে বিলকিসের পরিবার এখন স্বাবলম্বী। শুধু বিলকিস নন, হাতিয়া উপজেলার চর এলাহী, চানন্দি, হরণী, নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের অসংখ্য পরিবার ‘সমৃদ্ধি’ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলেছে।

সরেজমিন হাতিয়া উপজেলার চর এলাহী, চানন্দি, হরণী, নিঝুম দ্বীপসহ কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেল, চারদিকে সবুজের বিপ্লব। বাড়ির আঙিনা কিংবা বিশাল ক্ষেত যেদিকেই চোখ যায় শুধু শীতকালীন সবজি। কেউ করেছেন শিম চাষ।

কেউ ফুলকপি-বাঁধাকপি। কেউ করেছেন টমেটো-লাউ। আবার অনেকে বিশাল পুকুরে মাছ চাষ করেছেন। চর এলাহী ইউনিয়নের ফেরদৌস বেগম বিউটির বাড়িতে গেলে যে কারো চোখ জুড়িয়ে যাবে। ২৮০ শতাংশ জমির ওপর আট প্রজাতির ঔষধি গাছ লাগিয়েছেন তিনি। আছে বনজ ১৭৫ এবং ফলদ ৪৬ প্রজাতির গাছ। বাড়িতে আছে চারটি গরু, ১৪টি ছাগল, ১০০টি মুরগি, একটি ভেড়া, ১০টি দেশি হাঁস ও তিনটি চীনা হাঁস। একটি স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট। আছে একটি পুকুর, যেখানে সব ধরনের মাছ চাষ হয়। সমৃদ্ধি কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে বিউটির পরিবার এখন স্বাবলম্বী। চানন্দি ইউনিয়নের আলেয়া বেগম, সকিনা বেগম, বিবি কুলসুম, ফাতেমা আক্তারও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে অতি দরিদ্রদের তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নে কয়েকজন মিলে সমিতি গঠন করে নিজেদের ক্ষেতে শিম, কপি, লাউসহ বিভিন্ন শীতের সবজি চাষ করেছেন। তবে তাঁদের অভিযোগ, সবজি চাষ করলেও তাঁরা পণ্যের কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয় তাঁদের। নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নে একটি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা গেলে পণ্য সংরক্ষণ করা যেত। পণ্য সংরক্ষণ করতে পারলে সে পণ্যের কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যেত বলে জানিয়েছেন কয়েকজন কৃষক।

পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘সমৃদ্ধি’ কর্মসূচি দেশের দারিদ্র্যবিমোচনে একটি নতুন ধারণা। এ কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে সমৃদ্ধি কর্মসূচির অনেক পার্থক্য আছে। এনজিওদের মতো দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরাসরি ঋণ দেওয়া হয় না সমৃদ্ধি কর্মসূচিতে। এনজিওরা শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ঋণগ্রহীতা ওই ঋণ নিয়ে কোথায় খরচ করছে; সেটি নজরদারি করা হয় না। তা ছাড়া ওই ঋণের সুদের হারও বেশি (২৭ থেকে ৩৫ শতাংশের মতো)। ঋণ দেওয়া ছাড়া একটি পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান তৈরিতেও কাজ করে না এনজিওগুলো। ঋণ নেওয়ার পরের সপ্তাহ থেকে কিস্তি দিতে হয় ঋণগ্রহীতাকে। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি ঋণ নিয়ে সে টাকা পরিশোধ করতে পারে না। ফলে ওই পরিবার দরিদ্রই থেকে যায়।

এর বিপরীতে সমৃদ্ধি কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্যই থাকে শুধু ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া নয়, একটি পরিবারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। যাতে করে ঋণ নিয়ে সে টাকা পরিশোধ করতে পারে। সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় প্রথমে একটি দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করা হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ওই পরিবার কী কাজ করতে চায়, তার মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তারপর পরিবারের চাহিদার আলোকে ঋণ দেওয়া হয়। সে ঋণের সুদের হার থাকে (বিভিন্ন শ্রেণিতে) ৯ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে। ঋণ নেওয়ার পর কখন থেকে ঋণের অর্থ পরিশোধ করা হবে সেটি ঋণগ্রহীতাই ঠিক করে দেয়। তা ছাড়া যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেওয়া হয়েছে, সে অনুযায়ী কাজটি করা হয়েছে কি না তা নিয়মিত নজরদারি করা হয়। পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত ও হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের বৈকালিক পাঠদান দিয়ে থাকে পিকেএসএফ। সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ পানির জন্য নলকূপের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।


মন্তব্য