kalerkantho


সংসদে শোক প্রস্তাব

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভূমিকা ছিল একাই এক শ : প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভূমিকা ছিল

একাই এক শ : প্রধানমন্ত্রী

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গতকাল ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরীন শারমিনসহ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা। ছবি : পিআইডি

বর্ষীয়ান রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে তাঁর প্রতি সর্বসম্মত শোক জানিয়েছে জাতীয় সংসদ। এই শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে দেশ একজন বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও সংগ্রামী পার্লামেন্টারিয়ান ও রাজনীতিককে হারাল। তৎকালীন গণপরিষদে বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভূমিকা ছিল একাই এক শ। বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন সংসদীয় গণতন্ত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অন্য সংসদ সদস্যরাও সুরঞ্জিতের দৃঢ়চেতা, বাগ্মিতা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, অবিচল সংগ্রামী জীবনের কথা তুলে ধরেন।

আলোচনা শেষে শোক প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরপর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। শোক প্রস্তাব গ্রহণ শেষে সাংবিধানিক রেওয়াজ অনুযায়ী দিনের অন্যান্য কার্যসূচি স্থগিত রেখে সংসদ অধিবেশন আজ সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

অধিবেশনের শুরুতেই শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন স্পিকার। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় আরো অংশ নেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, সরকারি দলের ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ড. আবদুর রাজ্জাক।

আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আজীবন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন।

তিনি যেকোনো বিষয়ে তাত্ক্ষণিক যুক্তি ও রেফারেন্স দিয়ে কথা বলতে পারতেন। কঠিন বিষয়ও হাস্যরসের মাধ্যমে সহজ করে তুলে ধরতে পারতেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিক জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই আমাদের চলতে হয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ বর্তমানে এখানে থাকা অনেক মন্ত্রী-নেতাও আহত হন। কিন্তু হামলার পর সংসদে আমাদের একটি কথাও বলতে দেওয়া হয়নি। বরং প্রধানমন্ত্রী হয়ে সংসদে খালেদা জিয়া যখন বলেছিলেন, আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে গ্রেনেড নিয়ে হামলা করেছি, তখন বিএনপির নেতারা হাততালিও দিয়েছেন। ’ এ সময় তিনি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অবদানের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন জারির পর নিজ বাসায় সেনা সদস্যরা সুরঞ্জিতকে নির্যাতন করলে তাঁর ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা জানান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, গণপরিষদে সংবিধান রচনার সময় অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে। তখন বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল ‘একাই এক শ’।

রওশন এরশাদ বলেন, ‘যখন কোনো মানুষ মারা যায়, তখন তাঁকে মূল্যায়ন করি। বেঁচে থাকতে করি না। ’ তিনি বলেন, ‘বেঁচে থাকতে আমরা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে যথাযথ মূল্যায়ন করিনি। ’

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, “প্রথমে তাঁর সঙ্গে দেখার পর উনি আমাকে বলেছিলেন—‘আপনি রং প্রফেশনে রয়েছেন। ’ ২০০১ সালে যখন রাজনীতিতে আবার আসলাম তখন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আমাকে বললেন—‘মুহিত ভাই, রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত এলেন, কিন্তু এত দেরি করে কেন এলেন?’”

সংসদ চত্বরে সুরঞ্জিতকে শেষ বিদায়

জাতীয় সংসদে জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে তাঁর। আর আসবেন না কোনো দিন। বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে তাঁর প্রিয় সংসদের চত্বরে শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় শেষ বিদায় জানালেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরা। গতকাল রবিবার বিকেল ৩টার দিকে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বরেণ্য এই রাজনীতিকের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশিষ্ট রাজনীতিকরা। রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের শ্রদ্ধা জানানোর আগে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সুরঞ্জিতের প্রতি জানানো হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান।

কফিনে প্রথমে ফুল দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, তারপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও প্রয়াত এই সংসদ সদস্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ ধ্রুবেষানন্দ মহারাজ এ সময় বিশেষ প্রার্থনা করেন।


মন্তব্য