kalerkantho


১৫৬ বছর পর বাংলায় হলো পুলিশ আইন

ডিএমপি-সিএমপি অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ

ওমর ফারুক ও সরোয়ার আলম   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



১৫৬ বছর পর বাংলায়

হলো পুলিশ আইন

পুলিশ পরিচালনার জন্য ব্রিটিশদের তৈরি পুলিশ আইন-১৮৬১ বাংলা করা হলো ১৫৬ বছর পর। এ ছাড়া ওই সময়ের পরে জারি করা আরো ১৪টি অধ্যাদেশ (অর্ডিন্যান্স) ও বিধিমালা (রুলস) বাংলা করা হয়েছে।

এ ছাড়া ওই অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ আমলের কয়েকটিকে আইনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এ তালিকায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) অধ্যাদেশ রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ আইনসহ ১৫টি আইন, অধ্যাদেশ ও বিধিমালা বাংলায় রূপান্তর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ১৫টি আইন ও বিধিমালা বাংলা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, কিছুদিন আগে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পুলিশের আইন ও অধ্যাদেশগুলো ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে সেগুলো পুলিশ সদর দপ্তরকে বলা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বাংলায় রূপান্তর হওয়া আইন ও বিধিমালা মন্ত্রিপরিষদে পাঠাতে চেয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রিপরিষদ জানিয়েছে আপাতত রাখার জন্য। ’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটা আইনে রূপ নিতে পারে বলে জানতে পেরেছি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ আমলে যেসব অধ্যাদেশ জারি হয়েছে সেগুলোকে আইনে রূপ দেওয়ার একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিএমপি ও সিএমপি অধ্যাদেশও রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিষ্কার করে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। ’

১৯৭৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠা হয় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ওই সময় দেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ছিল না। ফলে রাষ্ট্রপতির আদেশে একটি অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ ইউনিটটি। ওই অধ্যাদেশকে ৪১ বছর পর এবার আইনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

এদিকে গত মাসে পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নানাবিধ দাবি করা হয়েছিল পুলিশের পক্ষ থেকে। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলের আইনটি পরিবর্তনের জন্য পুুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা দাবি করেছেন। আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্রিটিশ আমলের আইনটি সংশোধন করার ব্যাপারে আমরা কথা বলেছি। প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট। তিনি আমাদের যেকোনো সমস্যা ও দাবি-দাওয়া পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। ’

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশের যারা বিসিএসের অষ্টম ব্যাচে ছিল, প্রশাসনসহ অন্যান্য ক্যাডারে ব্যাচমেটরা অতিরিক্ত সচিব ও সচিব হয়ে গেছেন। অথচ পদ খালি না থাকায় আমাদের এখনো ডিআইজি পদেই থাকতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি আমাদের একই দায়িত্বে সংযুক্ত রেখে সুপার নিউমারি পদ সৃষ্টির ব্যবস্থা করার জন্য। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি দেখবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। ’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যখন সংসদ থাকে না তখন অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপ নিতে হলে সেগুলো সংসদে পাস হতে হবে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের পর পাস করলে আইনে পরিণত হবে। ’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অর্ডিন্যান্সের অধীনে বিধিমালা তৈরি করা যায় না। আইন হলে বিধি তৈরি করা যায়। ’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলায় রূপান্তর করা আইন, অধ্যাদেশ ও বিধিমালার মধ্যে রয়েছে দ্য পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১, দ্য পুলিশ (ইনসাইটমেন্ট টু ডিজ্যাফেকশন) অ্যাক্ট-১৯২২, দ্য রিক্রুটমেন্ট রুলস ফর দ্য পোস্ট অব টেলিকমিউনিকেশন টেকনিশিয়ান (অপারেশন) অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন টেকনিশিয়ান (মেইনটেইন্যান্স)-১৯৬৮, দ্য রিক্রুটমেন্ট রুলস ফর দ্য পোস্ট অব অ্যাসিসট্যান্ট টেলিকমিউনিকেশন টেকনিশিয়ান (অপারেশন) অ্যান্ড অ্যাসিসট্যান্ট টেলিকমিউনিকেশন টেকনিশিয়ান (মেইনটেইন্যান্স)-১৯৬৮। এ ছাড়া রয়েছে দ্য রিক্রুটমেন্ট রুলস ফর দ্য পোস্ট অব রেডিও অপারেটর, রেডিও মেকানিক অ্যান্ড মাস্ট মেকানিক-১৯৬৯, দ্য জুনিয়র পুলিশ সার্ভিস রুলস-১৯৬৯, দ্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬, দ্য পুলিশ অফিসার্স (স্পেশাল প্রভিশনস) অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬, দ্য চিটাগাং মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স-১৯৭৮, দি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স-১৯৭৯, দ্য বিসিএস (পুলিশ) কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলস-১৯৮০, দি অ্যাসিসট্যান্ট টেলিকমিউনিকেশন অফিসার রিক্রুটমেন্ট রুলস-১৯৮২, দ্য টেলিকমিউনিকেশন অফিসার রিক্রুটমেন্ট রুলস-১৯৮৩, দ্য খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স-১৯৮৫ এবং দ্য পুলিশ (নন-গেজেটেড এমপ্লয়ি) ওয়েলফেয়ার ফান্ড অর্ডিন্যান্স-১৯৮৬।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর তৎকালীন সরকার ১৮৬১ সালে এ উপমহাদেশের প্রথম পুলিশ আইন তৈরি করে। উপমহাদেশ থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় এবং ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সংরক্ষণের হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করা হয় পুলিশবাহিনী। তাদের দিয়েই ব্রিটিশরা ৮৬ বছরের বেশি তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও লালন-পালন করেছিল। ১৮৮৪ সালে বেঙ্গল পুলিশ ম্যানুয়াল নামে পুলিশের প্রথম প্রবিধিমালা প্রকাশ করা হয়। ১৮৯৭, ১৯০৬ ও ১৯১১ সালে আরো অনেক পরিবর্তন আনা হয় পুলিশ আইনে। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন করা হয় ১৯১৫ সালে। ১৯২৭ সালে তিন খণ্ডের পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল প্রণয়ন করা হয়। তবে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ ও ১৯৪৩ সালে আরো দুই দফা পুলিশ আইনটি সংশোধন করে।

২০০৭ সালে সেনাশাসিত সরকার ব্রিটিশ আমলের আইন পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেয়। একটি খসড়াও করা হয়। শেষ পর্যন্ত সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। এরপর ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘বাংলাদেশ পুলিশ আইন-২০১৩’ খসড়া পাঠানো হয়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইনটি নিয়ে কাজ করার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো পুলিশ আইনের খসড়া ও বিভিন্ন দেশের পুলিশ আইনের ভালো দিকগুলো নিয়ে নতুন খসড়ার কাজ শুরু করে। আজ পর্যন্ত সেই খসড়া চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।


মন্তব্য