kalerkantho


বাড়বাড়ন্ত কোচিং বাণিজ্য

শিক্ষকদের অর্থলোভের আগুনে হাওয়া দিচ্ছেন অভিভাবকরাও

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিক্ষকদের অর্থলোভের আগুনে হাওয়া দিচ্ছেন অভিভাবকরাও

কোচিং সেন্টারের জনপদ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে ময়মনসিংহ শহর। যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অসংখ্য কোচিং সেন্টার।

গাদাগাদি পরিবেশে এসব কোচিং সেন্টারে ছেলেমেয়েরা আবার নিজ ইচ্ছাতেই ভর্তি হচ্ছে। অনেক কোচিং সেন্টারে ভর্তির জন্য তদবিরও চলে। অভিভাবকদের যুক্তি—স্কুলে ভালোভাবে লেখাপড়া হয় না। তাই সন্তানকে কোচিংয়ে পড়ানোর কোনো বিকল্প তাঁদের সামনে নেই। উল্টো দিকে স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, বাইরে কোচিং না করেও অনেক ছেলেমেয়ে ভালো ফল করছে। কোচিং সেন্টারে সন্তান পড়ানোটা অনেক অভিভাবকের কাছে অনেকটা ফ্যাশন হয়ে উঠেছে।

বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও জিলা স্কুল—ময়মনসিংহ শহরের স্বনামধন্য দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আছে সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুলও। জেলার সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষকরাই এ তিনটি স্কুলের শিক্ষক।

বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা নানা রকম সরকারি প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হলেও এ স্কুল দুটির শিক্ষকদের সে সমস্যা নেই। এর পরও এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটিং সেন্টারগুলোয় ভিড় করছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে স্কুলগুলোয় লেখাপড়ায় কোনো ঘাটতি আছে?

শহরের প্রতিষ্ঠিত বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় সবগুলোতেই বিদ্যাময়ী, জিলা, ল্যাবরেটরিসহ অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা পাঠ নিচ্ছে।

শহরের বাউন্ডারি রোডের আইডিয়েল এডুকেয়ারে দেখা গেছে, একটি পুরনো বাড়িতে গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীরা পড়ছে। অভিভাবকরা বাইরে বসে আছেন দলবেঁধে। এই কোচিং সেন্টারের প্রদীপ চন্দ্র সাহা জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে পাঁচটি শ্রেণির তিন শিফটে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২৫০ জন। কোন কোন স্কুলের শিক্ষার্থী আছে—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, জিলা, বিদ্যাময়ীসহ সব স্কুলেরই শিক্ষার্থীই আছে। পঞ্চম শ্রেণিতে তিনি মাসিক বেতন ও পরীক্ষা বাবদ নেন মোট এক হাজার ৩০০ টাকা।

নাহা রোডের ক্যামব্রিজ মডেল কোচিংয়েও দেখা গেছে শিক্ষার্থীর ভিড়। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম বলেন, তাঁদের এখানে জিলা ও বিদ্যাময়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরাই পড়তে আসে। মাসে এক হাজার টাকা করে নেন তাঁরা।

ময়মনসিংহের এক রমরমা কোচিং সেন্টারের নাম সিদ্দিক বেসিক বাংলা। এখানেও গাদাগাদি করে ক্লাস নেওয়া হয়। সপ্তাহে মাত্র তিন দিন পড়ার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয় এ কোচিং সেন্টার, চলে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।

এখানকার এক ছাত্রী জানাল, সপ্তম শ্রেণিতে তার মাসিক বেতন ৮০০ টাকা। দেখা গেছে, এখানে একটি কক্ষে ২০টি বেঞ্চে একসঙ্গে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী পড়তে বসে। এই সেন্টারের পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক জানান, তাঁর কোচিং সেন্টারেও জিলা, বিদ্যাময়ীসহ বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা আসে। আবার কোনো কোনো শিক্ষকও নিজ স্কুলের শিক্ষার্থীসহ অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে রমরমা প্রাইভেট বাণিজ্য চালাচ্ছেন। বিজ্ঞান শিক্ষকরা এ ক্ষেত্রে সবাইকে ছাড়িয়ে। যেমন, বিদ্যাময়ী স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক আনোয়ার কাদেরের রয়েছে শতাধিক শিক্ষার্থী। তিনি প্রতিজনের কাছ থেকে মাসিক বেতন নেন এক হাজার ২০০ টাকা।

স্কুলগুলোয় নিয়মিত উপস্থিতির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহটাও লক্ষণীয়। জানা গেছে, নবম ও দশম শ্রেণিতে ওঠার পর শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে কোচিং সেন্টারমুখী হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে তাদের পেয়ে বসে স্কুলবিমুখতাও।

গত ৩০ জানুয়ারি বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, দশম শ্রেণির ‘ক’ সেকশনে প্রভাতি শাখায় ৮৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৩০ জন উপস্থিত হয়েছে। আর দিবা শাখায় ৮৭ জনের মধ্যে উপস্থিত মাত্র ২০ জন। এই শ্রেণির ‘খ’ সেকশনে প্রভাতিতে ৭৮ জনের মধ্যে ৩৪ জন আর দিবা শাখায় ৬৮ জনের মধ্যে ৩০ জনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জিলা স্কুলে গত ৩১ জানুয়ারি দশম শ্রেণিতে ২৭৮ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিল ১৫১ জন।

কোচিংয়ে ঝুঁকে পড়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে দুই ধরনের তথ্য মিলেছে। জানা গেছে, বেশ কিছু বিষয়ে শিক্ষকরা ক্লাসে ভালোভাবে পাঠদান করাতে পারেন না। ক্লাস টিচারের ব্যর্থতা পুষিয়ে নিতে বাইরে প্রাইভেট বা কোচিং করে শিক্ষার্থীরা। আরেকটি তথ্য হলো, অনেক অভিভাবকের ধারণা যে কোচিং না করালে ছেলেমেয়ে ভালো ফল করবে না। তাই তাঁরা আগ বাড়িয়ে সন্তানকে কোচিংয়ে পড়াতে তত্পর হয়ে ওঠেন।

বিদ্যাময়ী স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা নাছিমা আক্তার বলেন, ‘নিয়মিত পাঠদানের ক্ষেত্রে সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছি। সব কিছু ভালোই চলছে। এর পরও অভিভাবকদের ধারণা, কোচিং না করালে সন্তান ভালো করবে না। ’

জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমীন কালাম বলেন, ‘সমস্যাটি উভয়মুখী। অভিভাবকদের কথাও সত্য, আবার স্কুল কর্তৃপক্ষের কথাও সত্য। তবে স্কুলে লেখাপড়া সব দিক দিয়ে আরো বাড়ানো দরকার।


মন্তব্য