kalerkantho


চট্টগ্রাম

ক্লাসের চেয়ে বেশি সময় যায় কোচিং-প্রাইভেটে

টাকার শ্রাদ্ধ, সৃজনশীলতায় হাতকড়া

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক ছাত্র সকাল ৮টা থেকে সোয়া ১১টা পর্যন্ত ক্লাস করে দুপুর ১২টা নাগাদ বাসায় ফেরে। দুপুরের খাওয়ার ফাঁকে মা বিজ্ঞানের প্রাইভেট টিউটরের কাছে যাওয়ার জন্য ছেলের ব্যাগে বই-খাতা গুছিয়ে দেন।

ভাত খেয়েই সে রওনা দেয়। দুপুর ১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত নগরের জামাল খান এলাকায় প্রাইভেট পড়ে সে। ৩টায় বাসায় ফিরেই গণিতের প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে বসে। এরপর বাসা থেকে এক কিলোমিটার দূরে সিরাজ-উদ-দৌলা রোডে একটি কোচিং সেন্টারে যায়। বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ইংরেজি বিষয়ে কোচিং শেষ করে বাসায় ফিরে উচ্চতর গণিত নিয়ে বসে সে টিউটরের কাছে। রাত ১০টায় পাঠ শেষ করে কিছুক্ষণ বাসায় নিজে নিজে পড়ে। আগামী মাস থেকে আরো দুটি কোচিংয়ে তার পড়ার বিষয়টি ঠিক করেছেন অভিভাবকরা।

প্রাইভেট টিউটর ও কোচিং বাবদ মাসে খরচ হয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা। তার ছোট বোন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চ বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।

সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ক্লাস। বিকেলের আগে তিনজন শিক্ষকের কাছে পড়তে যায় সে। সন্ধ্যায় আরো দুজনের কাছে পড়ে। তার পেছনে ব্যয় হয় মাসে সাত হাজার টাকা।

হালিশহরের ‘এল’ ব্লকে সিলভার বেলস্ কিন্ডারগার্টেনের সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী স্কুলে ক্লাস করে সকাল ৮টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত। মাসিক বেতন এক হাজার ১০০ টাকা। বাসায় যাওয়ার পর তাকে দৌড়াতে হয় প্রাইভেট পড়ার জন্য—বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত গণিত ও বিকেল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত বিজ্ঞান পড়ে। ইংরেজি পড়ে বাসায়। এরপর আরো দুটি বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে যায়। মোট পাঁচটি বিষয়ে প্রাইভেট পড়ে ওই শিক্ষার্থী।

নগরের নামিদামি সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একই অবস্থা। ভালো ফলের আশায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের জন্য প্রাইভেট টিউটর রাখেন; তাদের কোচিংয়ে ভর্তি করান। স্কুলের সময়ের কয়েকগুণ বেশি সময় শিক্ষার্থীরা ব্যয় করে প্রাইভেট পড়ায় ও কোচিংয়ে। ফলে একদিকে শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার বাইরে সৃজনশীল কোনো কাজে জড়িত হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। এসব কারণে তাদের মেধা-মনন বিকশিত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।

নগরের জামাল খান, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, ঘাট ফরহাদ বেগ, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, হেম সেন লেন, নন্দনকানন, কোতোয়ালি, ফিরিঙ্গিবাজার, সদরঘাট, নিউ মার্কেট, খুলশী, জিইসি মোড়, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় বেশির ভাগ কোচিং সেন্টার। এসব সেন্টারে সারাদিনই ক্লাস থাকে। একেকটি ব্যাচে ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থী। প্রতিটি বিষয়ের জন্য দেড় থেকে দুই হাজার টাকা ফি নেওয়া হয়। নাম প্রকাশ না করে এক অভিভাবক বলেন, ভালো ফলের আশায় সন্তানকে কোচিংয়ে ও প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়াতে হচ্ছে। স্কুলে লেখাপড়া কম হয়।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মাহবুব হাসান বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ পাঠদান করা হলে কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিউটরনির্ভর হওয়ার দরকার নেই। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সন্তানরা লেখাপড়ার পাশাপাশি সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যাতে সম্পৃক্ত থাকতে পারে সেদিকে তাদের খেয়াল রাখতে হবে। ’

চট্টগ্রাম পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সবাই জিপিএ ৫ পেতে চায়। সন্তানরা জিপিএ ৫ পাওয়ার জন্য না দৌড়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক—অভিভাবকদের এ ব্যাপারে ভাবা উচিত। শিক্ষার্থীদের কোচিং ও প্রাইভেটের চাপে না ফেলে স্কুলমুখী করা উচিত। ’


মন্তব্য