kalerkantho


দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা হবে

স্থলবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি দূর করার উদ্যোগ

ওমর ফারুক   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মালামাল খালাসে বিলম্ব, ছাউনি ও আবাসিক সুবিধার অভাব, ক্ষুদ্র আয়তন, দালালদের দৌরাত্ম্য, ঘুষ না পেলে অসাধু কর্মকর্তাদের হয়রানি এবং ভারতীয় ট্রাকচালকদের রান্না করে খাওয়ার প্রবণতাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের স্থলবন্দরগুলো। রয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাও। তবে অন্য সব ঘাটতি ও সমস্যা বন্দরগুলোর নিরাপত্তাকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এ অবস্থায় স্থলবন্দরগুলোর নিরাপত্তাঝুঁকি দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গঠন করা হয়েছে একটি কমিটি।

জানা গেছে, এ কমিটির মাধ্যমে স্থলবন্দরগুলোকে দালালমুক্ত করা, ভারতীয় ট্রাকচালক ও তার সহকারীকে রান্না করে খেতে বারণ করা, নতুন শেড তৈরি ও আয়তন বাড়িয়ে বন্দরগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করা হবে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে।

গত ২২ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেশের স্থলবন্দরগুলোর নিরাপত্তাসহ সার্বিক পরিস্থিতির ওপর সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন। উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ, অতিরিক্ত সচিব মো. মহিবুল হক, বাংলাদেশ বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বৈঠকে বেনাপোল, ভোমরা, টেকনাফ, সোনাদিয়াসহ দেশের সব স্থলবন্দরে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

সেখানে কোন কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ আছে, তাও আলোচনা করা হয়। আলোচনায় অগ্নি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতীয় ট্রাকচালকদের এ দেশের অভ্যন্তরে এসে রান্না করে খাওয়াটাকে গুরুতর সমস্যা বলে মনে করা হয়। প্রতিদিন ভারত থেকে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢোকে। পণ্য খালাস হতে দু-তিন দিন সময়ও চলে যায়। এ সময় ট্রাকগুলোর চালক ও সহকারীরা বন্দরে থাকার পাশাপাশি নিজেরা রান্না করে খাওয়া-দাওয়া করে। এ বিষয়টি নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যা বলে মনে করে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে দেশের প্রতিটি স্থলবন্দরে দালালদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে বলে তথ্য মিলেছে। আর এসব দালালের পৃষ্ঠপোষকতা করে বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। বন্দর কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে কালের কণ্ঠকে জানান, অনেক নতুন মানুষ বন্দর দিয়ে যাওয়া-আসা করে। তাঁরা কিছু বুঝে উঠতে না পারার কারণে দালালরা সুযোগটা নেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল। এ স্থলবন্দরটির গুরুত্ব বাড়লেও অবকাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়নি। বন্দরকে করা হয়নি আধুনিকায়ন। দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে ব্যবসায়ীরা। কাগজে-কলমে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে বেনাপোল বন্দরে কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। প্রায় ২০ বছর আগের তৈরি শেডগুলো এখন পুরনো হয়ে গেছে। বন্দরে আমদানি করা মালামাল লোড-আনলোডের জন্য ভাড়া করা বেশির ভাগ ক্রেনও নষ্ট থাকায় বিঘ্ন ঘটছে বন্দরের মালামাল খালাসের প্রক্রিয়ায়। জায়গা সংকট এবং লোড-আনলোডের যান্ত্রিক সমস্যায় বন্দরটিতে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ পণ্যজট।

জানা গেছে, বেনাপোল বন্দরে ভারত থেকে আমদানি করা মালামাল রাখার জন্য ৩৬টি শেড রয়েছে। বেনাপোল বন্দরের এসব গুদামে পণ্য ধারণক্ষমতা ৪৬ হাজার টন। কিন্তু সব সময়ই বন্দরে ৭০-৮০ হাজার টন পণ্য মজুদ থাকে। ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মালামাল ঝুঁকি নিয়ে রাখা হচ্ছে ঠাসাঠাসি করে। এমনকি ট্রাক টারমিনালসহ বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ গুদামে রাখা হচ্ছে। জায়গা সংকটে প্রতিদিন কয়েক শ’ ভারতীয় ট্রাক মালামাল নিয়ে বন্দরে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকছে খালাসের অপেক্ষায়।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে জানান, বেনাপোল বন্দরকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। নতুন করে আটটি শেড তৈরি করা হচ্ছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বেনাপোল বন্দরকে আমরা সিসিটিভির আওতায় আনার চেষ্টা করছি। পর্যায়ক্রমে অন্য বন্দরগুলোকেও সিসিটিভির আওতায় আনা হবে। ’

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর সোনামসজিদ দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত বলে জানা গেছে। সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত আবাসিক এলাকা এবং সড়ক কোনোটিই নেই সেখানে। জানা যায়, এ বন্দরটিতে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস অফিসে আসা-যাওয়ার একাধিক রাস্তা থাকায় যাত্রীদের কাগজপত্র ও ব্যাগ তল্লাশি করার জটিলতা দেখা দেয়। এমনকি মাঝেমধ্যে অবৈধ পণ্য প্রবেশ করলেও সঠিক তদারকি হচ্ছে না। এটা রোধ করতে হলে একটি মাত্র সদর রাস্তার প্রয়োজন। কার পাস ও চেকপোস্ট দুই স্থানে হওয়ায় ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর কাগজপত্র চেক করাতে গিয়ে চালকদের চরম হয়রানির শিকার হতে হয় এবং রাস্তার ওপর যানজটের সৃষ্টি হয়। বন্দরের ভেতরের রাস্তাগুলো ভাঙাচোরা হওয়ায় গাড়ি থেকে পণ্য ওঠানামার সময় অসুবিধা হয় বলে জানা গেছে।

বন্দরের সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব বিষয়েই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। যে কমিটি করা হয়েছে তারা বন্দরগুলোর সমস্যা দূর করা এবং উন্নয়ন কিভাবে করা যায় সে বিষয়ে সুপারিশ করবে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সমস্যা সমাধান করা হবে।


মন্তব্য