kalerkantho


ঘাসিয়ার চরে স্থানান্তরের সুপারিশ

রোহিঙ্গাদের ঠেঙ্গার চরে পাঠাতে আপত্তি জানিয়েছে বন বিভাগ

আরিফুর রহমান   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ঠেঙ্গার চরে পুনর্বাসনের উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছে বন বিভাগ। এর বদলে হাতিয়ার আরেক চর ঘাসিয়ার চরে স্থানান্তরের সুপারিশ করেছে সরকারের এ সংস্থা। গতকাল বৃহস্পতিবার বন বিভাগ থেকে এসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

গত বুধবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের হাতিয়ার ঠেঙ্গার চরে পুনর্বাসন করা হবে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে থাকবে। সেখানে তারা কক্সবাজারের তুলনায় ভালো থাকবে বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

তবে বন বিভাগ বলছে, রোহিঙ্গাদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত না করে বসবাস অনুপযোগী ওই চরে ছেড়ে দিলে সেখানে পাঁচ হাজার একরের ওপর থাকা গাছের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে। একই সঙ্গে সেখানকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। সে ক্ষেত্রে ঘাসিয়ার চরে ৫০০ একর জায়গার ওপর রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা যেতে পারে বলে পরামর্শ দিয়েছে বন বিভাগ।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বন বিভাগের প্রতিবেদনটি তারা এখন সরকারের নীতিনির্ধারকদের জানাবেন। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও জানানো হবে।

এদিকে বন বিভাগ থেকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে আসা যেসব রোহিঙ্গা এখন কক্সবাজারে বসবাস করছে, তাদের নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ঠেঙ্গার চরে পুনর্বাসন করা সম্ভব নয়। ইঞ্জিনচালিত নৌযান ছাড়া সেখানে যাতায়াতের কোনো সুযোগ নেই। হাতিয়া থেকে ঠেঙ্গার চরের দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের মতো। হাতিয়া থেকে সেখানে ইঞ্জিনচালিত জলযানে পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে।

বন বিভাগ তাদের প্রতিবেদনে আরো জানিয়েছে, জোয়ার আসলে ঠেঙ্গার চরটি ডুবে যায়। প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ঠেঙ্গার চরের ভূমি এখনো মানুষ বসবাস উপযোগী স্থায়িত্ব পায়নি। রোহিঙ্গাদের এখনই সেখানে থাকার সুযোগ করে দিলে পদভারে পুরো চরে ভাঙন শুরু হবে। একবার ভাঙন শুরু হলে পুরো চর সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, মিয়ানমার থেকে এ পর্যন্ত আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা আনুমানিক তিন লাখ। এর মধ্যে নিবন্ধনকৃত ৩৫ হাজার। বাকিদের কোনো নিবন্ধন নেই। নতুন করে মিয়ানমার সরকারের নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে আরো ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে বলে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থাসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার শরণার্থী ক্যাম্পে স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সরিয়ে হাতিয়া দ্বীপে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে গত বুধবার সাংবাদিকদের জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

বন বিভাগের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ঠেঙ্গার চরে ১০ হাজার একর জমিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে সেখানে পাঁচ হাজার একর জমির ওপর শ্বাসমূলীয় বাগান বা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট গড়ে তুলেছে বন বিভাগ। বাকি অংশে এখনো বাগান করার উপযোগী হয়ে ওঠেনি। ধারাবাহিকভাবে বনায়ন কার্যক্রম চালু রাখলে সাগর থেকে জেগে ওঠা এ চরের বিস্তার বাড়বে। একই সঙ্গে মাটির স্থায়িত্বও বাড়বে। তাই এখনই সেখানে রোহিঙ্গাদের না পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বন বিভাগের ওই প্রতিবেদনে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের বিকল্প জায়গা হিসেবে ঘাসিয়ার চরের কথা উল্লেখ করে বন বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই চরের জমির স্থায়িত্ব অনেক দিনের। জোয়ার আসলেও চর ভাঙার কোনো আশঙ্কা নেই। চরের মাটি শক্ত হয়ে গেছে। সেখানে চাষ উপযোগী হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষও বসবাস করতে পারবে। ঘাসিয়ার চর হাতিয়া উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে তিন কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে। ওই চরের ৫০০ একর এলাকা রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য নেওয়া যেতে পারে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ঘাসিয়ার চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করলে সেখানে বনের গাছ ও বাগান ক্ষতির আশঙ্কাও কম।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক সফিউল আলম চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে যোগাযোগ করা হলে সদ্য বিদায়ী প্রধান বন সংরক্ষক ইউনূস আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, কক্সবাজারে বনের জমি ও গাছ ধ্বংসের পেছনে প্রধান কারণ ছিল মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা। ঠেঙ্গার চরে যদি রোহিঙ্গাদের থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়, তাহলে সেখানে বন বিভাগের বন ও গাছ আর থাকবে না। সেগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে। এর সঙ্গে জীববৈচিত্র্যও নষ্ট হবে।


মন্তব্য