kalerkantho


দালানের ওপর ফুলের বাগান

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দালানের ওপর ফুলের বাগান

খুলনার দৌলদপুরে ছাদের ওপর বাগান গড়ে তুলেছেন সালেহা বেগম। ছবি : কালের কণ্ঠ

একটি দোতলা বাড়ির ছাদ। টবে টবে চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা ও টমেটোর গাছ। বোঝার উপায় নেই জায়গাটি একটি বাড়ির ছাদ। মনে হবে প্রকৃতি বন্দনার এক অপূর্ব বাগান। খুলনা শহরের দৌলতপুরের পূর্ব দেয়ানার সাদামাটা বাড়িটির নাম নির্ঝর। উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী সালেহা বেগম একজন কর্মজীবী নারী। তিনি বাড়ির ছাদে গড়ে তুলেছেন এই বাগান। গাছগুলোকে তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসেন, পরিচর্যা করেন।

সালেহা বেগম বলেন, ‘এটি মূলত ইকবাল-সালেহার বাগান। ইকবাল আমার স্বামীর নাম। তিনি ব্যবসা করেন।

আর চাকরির কারণে আমাকে জেলা, উপজেলার নানা জায়গায় যেতে হয়। বাগান আমি খুব বেশি দেখাশোনা করতে পারি না। ’  তিনি আরো বলেন, ‘১৯৯০ সালের দিকে এই বাগানটি গড়ে তোলা। এর বছর দুয়েক পরে সাতক্ষীরা বদলি হয়ে যাই। তখন ভেবেছিলাম আমার বাগানটি বুঝি আর থাকবে না। কিন্তু আমার স্বামী ইকবাল পরম মমতায় বাগানটি দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে। এখন সে-ই বাগানটি দেখাশোনা করে, পরিচর্যা করে। ’

জানা যায়, ছাদের ওপর টবে টবে বাগান করা বেশ ঝক্কি। চন্দ্রমল্লিকা চাষে আরো ঝক্কি। সাধারণত শাখা কলম থেকে এসব চারা তৈরি করা হয়। বীজ থেকে চারা করলে তা থেকে ভালো ফুল পাওয়া যায় না, আবার ফুল পেতেও সময় লাগে। অন্যদিকে ডাল কেটে শাখা কলম করলে ভালো ও তাড়াতাড়ি ফুল পাওয়া যায়।

সালেহা বেগম বাগান নিয়ে বলেন, ‘জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শাখা কলম করা শুরু হয়। গাঁদাসহ কিছু কিছু ফুলের গাছ বাণিজ্যিক নার্সারি থেকেও সংগ্রহ করা যায়। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে টবে রোপণ করা হয়। চন্দ্রমল্লিকা গাছ মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য উপাদান শোষণ করে। এ কারণে জৈব ও রাসায়নিক খাদ্যযুক্ত মাটিতে এ গাছ খুব ভালোভাবে সাড়া দেয়। এ কারণে বাগানে সার দিতে হয়। গোবর বা কম্পোস্ট সারের পাশাপাশি ইউরিয়া, টিএসপি, মিউরেট অব পটাশ, জিপসাম, বোরিক এসিড ও জিংক অক্সাইড সার প্রয়োগ করতে হয়। ’

গাছে লাগানো থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে এর পরিচর্যা করতে হয় খুব যত্নের সঙ্গে। সালেহার ভাষায়, এই কাজটি ‘শিশুকে লালন করার মতো। ’ সাধারণত বিকেলের দিকে ফুলের গাছের চারা লাগিয়ে গোড়ার মাটি চেপে দিতে হয়। চারা লাগানোর পর হালকা সেচ দিতে হয়। পানি যাতে বেশি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। চারা লাগানোর মাসখানেক পর গাছের সামনের অংশ কেটে দিতে হয়। এতে গাছ লম্বা না হয়ে ঝাঁকড়া হয়। চারাগাছে তাড়াতাড়ি ফুল এলে তা সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিতে হয়। ফুল গাছে পোকাও লাগে। ছাই রঙের এক ধরনের পোকা ছাড়াও জাব পোকার আক্রমণ হয়।   

ইকবাল-সালেহার বাগানে নানা ধরনের চন্দ্রমল্লিকা আছে। এটি অংঃবত্ধপবধব গোত্রের ফুল গাছ। যা চীন দেশীয় ঔষধি ফুলের গাছও বটে। কিন্তু জাপানিরা এই ফুলকে বিশেষ সমাদর করেছে। ফুলটি জাপানের রাজপরিবারে বিশেষ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ফুলটি প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রকারের। ফুলগুলো বিচিত্র বর্ণের।

অতি পরিচিত এই ফুলটি এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমূল্যও বেশ। ফুলদানি সাজানোর জন্য লম্বা ডাঁটাসহ এবং মালা গাঁথার জন্য ডাঁটা ছাড়া ফুল তোলা হয়। এই ফুলকে ছোট ও বড় দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর কিছু কিছু স্থানীয় নামও আছে। এর মধ্যে রয়েছে চন্দ্রমুখী, বাসন্তী, উজ্জ্বল হলুদ, মেঘামী, হালকা বেগুনি, উনা, চন্দমা,  স্নোবল, সোনার বাংলা, রোজডে ও পুইসা পকেট।

চন্দ্রমল্লিকার ইংরেজি নাম ক্রিস্যানথিমাম। শব্দটি গ্রিক থেকে এসেছে। ক্রিসস অর্থ ‘সোনা’ এবং এনথিমাম অর্থ ‘ফুল’। এর বৈজ্ঞানিক নাম ক্রিস্যানথিমাম ইন্ডিকাম। এ গাছ ৫০ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত  উঁচু  হয়ে থাকে। বৃহদাকৃতির ফুলগুলো সচরাচর সাদা, হলুদ অথবা পটল বর্ণের হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি চন্দ্রমল্লিকা ফুলের দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে। জাত দুটি হলো বারি চন্দ্রমল্লিকা-১ ও বারি চন্দ্রমল্লিকা-২।


মন্তব্য