kalerkantho


সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়বে পথনাটক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়বে পথনাটক

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গতকাল আট দিনব্যাপী জাতীয় পথনাট্যোৎসবের উদ্বোধন হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

টোকাই। ছিন্নমূল শিশুর প্রতিরূপ।

চরিত্রটি বিশেষ মহিমা পেয়েছে চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী ওরফে রনবী’র রংতুলির বদৌলতে। এই টোকাই শহীদ মিনার চত্বরে ক্যানভাসে প্রস্ফুটিত হলো স্বাধীনতার চেতনার মশাল হাতে। প্রিয় টোকাই চরিত্রকে ক্যানভাসে এঁকে এই নন্দিত শিল্পী রনবী উদ্বোধন করলেন জাতীয় পথনাট্যোৎসবের। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মুখরিত থাকবে পথনাটকের রাজনৈতিক চেতনাস্পর্শী উচ্চকিত সংলাপে।

প্রতিবছর ভাষাসংগ্রামের চেতনাসমৃদ্ধ ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে পথনাট্যোৎসব আয়োজন দীর্ঘদিনের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এর আয়োজক। উৎসবের শুরু ১৯৮৬ সাল। তার পর থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রতিবছর চলছে এ উৎসব। গ্রুপ থিয়েটারভুক্ত নাটকের দলগুলো তাদের সমসাময়িক পথনাটক মঞ্চায়ন করে এ উৎসবে।

এবার অংশ নিচ্ছে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ৪১টি নাট্যদল। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ছয়টি করে পথনাটক মঞ্চস্থ হবে।

এবারের ৩২তম পথনাটক উৎসবের উদ্বোধন পর্বটি ছিল ব্যতিক্রমী। শহীদ মিনারের পাদদেশে রাখা ক্যানভাসে রনবী কয়েক মিনিটে ফুটিয়ে তুললেন তাঁর প্রিয় চরিত্র টোকাই। শীর্ণ দেহ, ছেঁড়া কাপড়ের টোকাইয়ের এক হাতে অপরাজয়ের চিহ্ন, অন্য হাতে মশাল। এবারের উৎসবের মূল বক্তব্যই যেন ফুটে উঠল কীর্তিমান শিল্পীর অ্যাক্রেলিক মাধ্যমের রংতুলির ছোঁয়ায়। উদ্যোক্তারা ঘোষণা করলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়বে পথনাটক। একই সঙ্গে ব্যক্ত করলেন মানবিক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়। উৎসবের আনুষ্ঠানিক স্লোগান হচ্ছে ‘মূল্যবোধের অবক্ষয় রুখবো, মানবিক সমাজ গড়বো’।

উদ্বোধনী বক্তৃতায় রফিকুন নবী বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের এত বছর পরেও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বলতে হয়। কেন পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ নিয়ে কথা বলতে হয়? অবস্থা এমন হয়েছে যে আমাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমরা এ অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে চাই। ’ উৎসব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মূলত মানুষের কাছাকাছি আসার একটি মাধ্যম হচ্ছে পথনাটক। কোনো মঞ্চ বা মিলনায়তনে নয়, এ নাটকের সূচনাও হয়েছিল উন্মুক্ত আকাশের নিচে। এ ছাড়া পথনাটকের অন্তর্নিহিত বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ উৎসবের উদ্বোধনী অনু্ষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব আইটিআইয়ের সাম্মানিক সভাপতি রামেন্দু মজুমদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক  জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য দেন উৎসব আহ্বায়ক চন্দন রেজা। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল আকতারুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন ফেডারেশনের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী লাকী।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া পথনাটক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি এর শিল্পমান বিচারে আরো বেশি সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান রামেন্দু মজুমদার।

জাতীয় সংগীত পরিবেশনা ও শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। ফুলেল ভালোবাসা নিবেদন শেষে পালন করা হয় এক মিনিটের নীরবতা। সম্প্রতি  মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শিল্পিত প্রকাশ ঘটে নৃত্যদল স্পন্দনের নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনায়। ‘এ মাটি নয় জঙ্গিবাদের, এ মাটি মানবতার’ ও ‘দাও শৈর্য, দাও ধৈর্য’ গানের সুরে নাচ করে দলটি। উৎসবের উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে অভিবাসনহীন মানুষকে নিয়ে নাট্যধারার পথনাটক ‘জলে ভাসা পদ্ম’ প্রদর্শিত হয়।

আজ বুধবার প্রদর্শিত হবে থিয়েটার আরামবাগের ‘ফলাফল নিম্নচাপ’, খেয়ালী নাট্যগোষ্ঠীর ‘রক্তাক্ত ফাগুন’, তীর্থকের ‘নজরবন্দি’, মুক্তালয় নাট্যাঙ্গনের ‘ঘুম’, নাট্যযোদ্ধার ‘বুদ্ধি’।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জাতীয় পথনাট্যোৎসবের পাশাপাশি দেশের আটটি বিভাগে পৃথকভাবে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসে প্রদর্শিত হবে পথনাটক।


মন্তব্য