kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে জলদস্যুরা

৪৮ দস্যুর আত্মসমর্পণ, কমছে খুন ও অপহরণ

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সুন্দরবন ঘিরে জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি, হত্যা নিত্যদিনের ঘটনা। বেশ কিছু জলদস্যু বাহিনী এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু প্রতিকার বলতে জলদস্যুদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ পর্যন্তই। তবে আশার কথা বর্তমানে জলদস্যুদের তত্পরতা কমতে শুরু করেছে। অনেক বাহিনী নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে। গত ১৪২ দিনে ছয় জলদস্যু বাহিনীর অন্তত ৪৮ সদস্য আত্মসমর্পণ করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর ফলে সুন্দরবন এলাকায় খুন-অপহরণ কমতে শুরু করেছে।

চলতি বছরের ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে জলদস্যু ‘মাস্টার বাহিনী’র প্রধান মোস্তফা শেখসহ ১০ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। এর দেড় মাস পর ‘মজনু ও ইলিয়াস’ বাহিনীর দুই প্রধানসহ ৯ সহযোগী আত্মসমর্পণ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার ‘সাগর’ বাহিনীর প্রধানসহ ১৩ জলদস্যু স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। সব মিলিয়ে ১৪২ দিনের ব্যবধানে সুন্দরবনের ছয়টি দস্যু বাহিনীর অন্তত ৪৮ সহযোগীর আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটেছে।

র‌্যাবের দাবি, সুন্দরবনে তাদের ধারাবাহিক অভিযানের ফলে দস্যুরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। পাশাপাশি নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আত্মসমর্পণ করছে। যারা এখনো আত্মগোপনে রয়েছে, তারাও পর্যায়ক্রমে আত্মসমর্পণ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছে র‌্যাব।

৪৮ দস্যুর আত্মসমর্পণ : স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আত্মসমর্পণ করেছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক জলদস্যু ‘সাগর বাহিনী’র প্রধান মো. আলমগীর শেখ ওরফে সাগর। বৃহস্পতিবার বরগুনা সার্কিট হাউস মাঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে বাহিনীর ১৩ সদস্য। আত্মসমর্পণের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ২০টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৯৬ রাউন্ড গুলি জমা দেয় তারা। গত ৮ অক্টোবর জলদস্যু ‘শান্ত ও আলম’ বাহিনীর দুই প্রধানসহ ১৪ জলদস্যু অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছেন। দুপুর ১২টার দিকে র‌্যাব-৮-এর বরিশাল প্রধান কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সামনে আত্মসমর্পণ করে তাঁরা। এ সময় দেশি-বিদেশি ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজার আট রাউন্ড গুলি জমা দেওয়া হয়।

গত ১৫ জুলাই বনদস্যু ‘মজনু ও ইলিয়াস’ বাহিনীর দুই প্রধানসহ তাঁদের ৯ সহযোগী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সামনে আত্মসমর্পণ করেন। এই ঘটনার দেড় মাস আগে ৩১ মে মন্ত্রীর হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সুন্দরবনের জলদস্যু ‘মাস্টার বাহিনী’ বাহিনীর প্রধান মোস্তফা শেখসহ ১০ জলদস্যু।

আত্মসমর্পণের পর দস্যু বাহিনীর প্রধানরা বলেন, ‘নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে’ বাধ্য হয়ে তাঁরা দস্যুতার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ওই জীবনে সব সময় শঙ্কার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন তাঁরা। সম্প্রতি একাধিক বাহিনী দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য আত্মসমর্পণ করলে তারাও উদ্বুদ্ধ হন।

জানা যায়, এ পর্যন্ত সুন্দরবনকেন্দ্রিক যে ৩৫ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে, বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে থানায় অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়েছে। দায়েরকৃত মামলাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তদন্ত করছে। সেগুলোর প্রতিবেদন বিচারিক আদালতে জমা না দেওয়ার কারণে বিচারকার্য এখনো শুরু হয়নি।

দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আজ যারা আত্মসমর্পণ করেছে তাদের আমরা সব ধরনের আইনি সহায়তা দেব। আর যারা এখনো ফিরে আসেনি, তারাও দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

জেলে খুন ও অপহরণ : ৮ অক্টোবর সুন্দরবনকেন্দ্রিক দুটি জলদস্যু বাহিনীর প্রধান ও তাদের সদস্যরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করার ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে বঙ্গোপসাগরে দস্যুরা তাণ্ডব চালায়। সশস্ত্র জলদস্যুরা দফায় দফায় জেলেদের ট্রলারে লুটপাট চালিয়ে অন্তত ৫০ জন জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাঁদের বাড়ি বরগুনা সদর, পাঘরঘাটা, বাগেরহাটের মংলা ও রামপাল উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।

গত ১৭ জুলাই ভোলার মনপুরা ও নোয়াখালীর হাতিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় জলদস্যুদের গুলিতে এক জেলে নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে আরো অন্তত পাঁচ জেলে। নিহত মহসিন (২৫) মনপুরার বাসিন্দা।

২৯ জুন ভোরে পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমের সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকা থেকে সাত জেলেকে অপহরণ করা হয়। ১৬ আগস্ট ভোর ৫টার দিকে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে নদীতে কাঁকড়া ধরার সময় দুই জেলে জলদস্যু বাহিনী অপহরণ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ঘেঁটে জেলে অপহরণ ও খুনের ঘটনা জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : বরগুনা জেলা মত্স্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত জলদস্যুদের হাতে অন্তত ১০০ জেলে নিহত হয়েছে। বছর দুইয়েক আগেও ইলিশ মৌসুমে জেলে ট্রলারে দস্যুদের ডাকাতি, জেলে অপহরণ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। র‌্যাবের ব্যাপক তত্পরতার কারণে অন্তত ছয়টি দস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। পাশাপাশি এই সময়ে অপহরণ ডাকাতি নেই বললেই চলে। র‌্যাব তাদেল টহল অব্যাহত রাখলে নতুন করে আর কোনো বাহিনী তৈরি হতে পারবে না।

র‌্যাব-৮-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ইফতেখারুল মাবুদ সম্প্রতি মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, আত্মসমর্পণের পর থেকেই র‌্যাবের সঙ্গে দস্যুবাহিনীর কোনো বন্ধুকযুদ্ধ হয়নি। তবে র‌্যাব সব সময়ই সুন্দরবন এলাকায় টহল অব্যাহত রেখেছে। সেই অভিযানের কারণেই সুন্দরবন এলাকায় দস্যু বাহিনীর তত্পরতা কমে গেছে। এই ইলিশ মৌসুমে জেলে অপহরণ কিংবা মুক্তিপণের ঘটনা ঘটেনি। মূলত র‌্যাবে নানামুখী তত্পরতার কারণে দস্যুরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আরো কয়েকটি বহিনী আত্মসমর্পণ করতে পারে।


মন্তব্য