kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শেরপুরে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে চলছে হাতি হত্যা!

শেরপুর প্রতিনিধি   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শেরপুরে বৈদ্যুতিক ফাঁদ  পেতে চলছে হাতি হত্যা!

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ১৭ দিনের মধ্যে আরেকটি বন্য হাতির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গত সোমবার সকালে উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের তাওয়াকুচা নয়াপাড়া গ্রামের ধানক্ষেত থেকে মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়।

হাতিটির ময়নাতদন্ত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মৃত্যুর কারণ জানাতে পারেননি। তবে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে হাতিটি হত্যা করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, রবিবার রাতে আসা হাতির দলকে তাড়াতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ওই এলাকায় ছয় মাসে পাঁচটি বন্য হাতির মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে গত ১ অক্টোবর তাওয়াকুচা গ্রামের পার্শ্ববর্তী পানবর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে একটি বন্য হাতির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। সেটিরও মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। ওই ঘটনার তিন দিন আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পানবর গ্রামে হাতির আক্রমণে এক নারীর মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনায় ক্ষুব্ধ লোকজন দুটি বাচ্চা হাতিকে বৈদ্যুতিক ফাঁদে আটকে হত্যার পর গুম করে ফেলে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

অভিযোগ রয়েছে, বন ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা স্থানীয় লোকজনের ভয়ে হাতির মৃত্যুর কারণ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন না। বনের ভেতর বসতি গড়ে তোলা লোকজন এসব স্থানীয় হাতি তাড়াতে নিয়মিত বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহার করে বলে জানা গেছে। বন বিভাগের কর্মচারীরা স্থানীয় লোকজনের খারাপ আচরণের ভয়ে এ নিয়ে মুখ খুলতে চান না।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে বন বিভাগের লোকজন সোমবার সকালে মৃত হাতিটি উদ্ধার করে। আগের দিন রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ৭০-৮০টি বুনো হাতি দলবেঁধে তাওয়াকুচা গ্রামের আমজাদ হোসেনের ক্ষেতে নেমে ধান খাওয়ার সময় হাতিটি মারা যায়। ধান খাওয়ার একপর্যায়ে হাতির দলটি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে গ্রামের ৯টি ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও তছনছ করে। ধারণা করা হচ্ছে, ধানক্ষেতটিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ ছিল।

বন বিভাগের ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচা বিট কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম জানান, মৃত হাতিটি একটি পূর্ণবয়স্ক মাদি হাতি। তবে কিভাবে হাতিটি মারা পড়েছে তা তিনি জানাতে পারেননি। তিনি জানান, ময়নাতদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। দুপুরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা মৃত হাতিটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। পরে বিকেলে ঘটনাস্থলের পাশেই হাতির মরদেহটি মাটিচাপা দেওয়া হয়।

গত বেশ কিছুদিন ধরে কাংশা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বন্য হাতির তাণ্ডব বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দেড় মাসে ৯ জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একদিকে বন্য হাতির আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ লোকজন হাতি হত্যাকে প্রতিকার মনে করছে। অন্যদিকে, মানুষের পাতা ফাঁদ হাতিকে আরো উত্তেজিত করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গতকাল সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বন্য হাতির মৃতদেহ দেখতে শিশু, নারীসহ শত শত জনতা ভিড় করছে। এ সময় এলাকাবাসী জানায়, রাতে হাতির দলের চিত্কার শুনে আশপাশের কয়েক শ মানুষ তাওয়াকুচা টিলাপাড়া খেলার মাঠে জমায়েত হয়। ওই এলাকার জহুরুল হক জানান, লোকজন মশাল জ---ালিয়ে, পটকা ফাটিয়ে, জেনারেটরের আলো জ---ালিয়ে ও টিন বাজিয়ে শব্দ করাসহ হইহুল্লোর শুরু করলে তা না মেনে হাতির দল উল্টো তাদের দিকে ধেয়ে আসে। এ সময় হাতির দল সামনের লোকালয়ে চলে এসে স্থানীয় সীমান্ত সড়ক পাড়ি দিয়ে তাওয়াকুচা নয়াপাড়া গ্রামে তাণ্ডব চালায়। হাতির দল তাণ্ডব চালিয়ে মমেনা খাতুন, ময়নাল মিয়া, ময়ছান আলী, আজির উদ্দিন, মেহের আলী, আমজাদ হোসেন, আবদুল কাদির, হোসেন আলীর বাড়ি এবং গুরুচরণ দুধনই গ্রামের আছিয়া খাতুনের দোকান ঘর ভাঙচুর করে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রবিবার সন্ধ্যায় নেমে আসা হাতির দলটি থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয়রা জেনারেটরে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করে। সেই জেনারেটরের বৈদ্যুতিক শকেই হাতিটি মারা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা দীপক কুমার সরকার মৃত হাতিটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। বিকেলে তিনি জানান, মৃত হাতিটির শুঁড়ের নিচে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হাতিটি শুঁড়সহ লম্বায় ১৮ ফুট। বয়স ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে হবে। মৃত হাতিটি বসা অবস্থায় পাওয়া যায়। এটি নারী হাতি। নারী হাতিরা সাধারণত দলনেতা হয়ে থাকে। মৃতদেহ ঘটনাস্থলের পাশেই মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তকালে হাতিটির পাকস্থলীসহ কিছু অংশ সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়ার পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে দীপক কুমার জানান।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. এ এম পারভেজ রহিম বলেন, ‘অনেক লোক বাইরের এলাকা থেকে বনের ভেতর প্রবেশ করে সরকারি সম্পত্তি জবরদখল করে বসতবাড়ি করেছে। কেউ কেউ বন বিভাগের জমিতেও বাসাবাড়ি করেছে। হাতির বিচরণের জায়গায় এখন মানুষ প্রবেশ করেছে। বন্য হাতির প্রতি তারা নির্মম আচরণ করছে। অচিরেই বনে-পাহাড়ে জবরদখলকারী অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের উচ্ছেদে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ’

উল্লেখ্য, গত ছয় মাসে ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী হালচাটি, তাওয়াকুচা, গান্ধীগাঁও ও পানবর এলাকায় পাঁচটি বুনো হাতি মৃত্যুর ঘটনা ঘটল।


মন্তব্য