kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্রাহ্মণবাড়িয়া

অপ্রতিরোধ্য মাদক

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন ও পুলিশ। জেলা শহরে মাদকবিরোধী সমাবেশ শেষে স্থানীয় জনতার সহায়তায় একাধিক মাদক কারবারির ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কিছুদিন আগে।

আখাউড়ার চিহ্নিত মাদক কারবারি রহিজ উদ্দিন সম্প্রতি কসবায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। আখাউড়ার দুটি ইউনিয়নের জনগণের হাতে লাঠি-বাঁশি দিয়েও মাদক নির্মূলের চেষ্টা করছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক মাদকসেবী ও কারবারিদের প্রায়ই সাজা হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালতে। এত কিছুর পরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থেমে নেই মাদক কারবার। জেলার সীমান্তপথ দিয়ে প্রতিদিনই আসছে বিভিন্ন রকমের মাদকদ্রব্য। জেলাজুড়ে রয়েছে বেশ কিছু মাদকের স্পট। এ অবস্থায় বিশেষ করে তরুণসমাজ আক্রান্ত হচ্ছে মাদকের থাবায়।

আখাউড়া উপজেলার টানুয়াপাড়া গ্রামে যুবক কবির মিয়া নেশার জন্য চাওয়া মাত্র টাকা না পেলে মা-বাবার গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না। ভাঙচুর চালায় বাড়িঘরে। উপায় না দেখে কবিরের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে নালিশ করেন বাবা মনু মিয়া। গত ৩ অক্টোবর পুলিশ তাকে ধরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তুলে দেয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের একটি নামকরা স্কুলের কয়েকজন ছাত্রী মাদক সেবন করে বলে কয়েক মাস আগে অবহিত করা হয় জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভায়। ওই কমিটির সদস্য এক চিকিৎসক সভায় জানান, তিনি ওই স্কুলের একাধিক শিক্ষার্থীর ইয়াবা আসক্তি-সংক্রান্ত চিকিৎসা করেছেন। এর পর থেকে ওই স্কুলের সন্দেহভাজন শিক্ষার্থীদের বইয়ের ব্যাগ তল্লাশি করে ক্লাসরুমে ঢোকানো হয়।

গত ১ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদস্য মো. মান্নানের কাছ থেকে দুই হাজার পিস ইয়াবা বড়ি জব্দ করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ওই ঘটনায় আদালত পুলিশের সদস্য মান্নানের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় মামলাও হয়। তবে বিভিন্ন কারণে বিষয়টি তখন চেপে যান সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, জেলার কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর উপজেলা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা। ওই সীমান্ত দিয়েই মূলত গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য পাচার হয়ে আসে। নতুন করে যোগ হয়েছে ইয়াবা, যা বাংলাদেশের ভেতর থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসে।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র মতে, অন্তত ৬০-৭০ জন বড় মাদক কারবারি সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী আখাউড়া ও বিজয়নগর উপজেলায় কারবারির সংখ্যা বেশি। এ ছাড়া কসবা, আশুগঞ্জ, বাঞ্ছারামপুরে রয়েছে বেশ কয়েকজন বড় মাদক কারবারি। আগে ফেনসিডিলের পাচার বেশি হলেও এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা।

জানা গেছে, আখাউড়ার মনিয়ন্দ, মোগড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা, বিজয়নগরের নলগড়িয়া, নোয়াবাদী এলাকা, কসবার গোপীনাথপুর ও বায়েক এলাকা দিয়ে মাদকদ্রব্য প্রবেশ করে বেশি। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইস্কপ ইত্যাদি। আখাউড়ার মনিয়ন্দ, আজমপুর, নুরপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে একাধিক মাদকের স্পট। এসব স্পটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদকসেবীরা আসে। মনিয়ন্দ ও নুরপুরে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিকবার তোপের মুখে পড়ে। বিজয়নগরের কাশীনগর গ্রামের অর্ধশত বাড়িতে গাঁজা বিক্রি হয়। নলগড়িয়া সীমান্ত দিয়ে আসা গাঁজা রাখা হয় কাশীনগর গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে। অবশ্য সীমান্ত এলাকার বেশির ভাগ স্থানে কাঁটাতারের বেড়া হওয়ায় এখন আর আগের মতো অবাধে মাদক প্রবেশ করতে পারে না। তবে চোরাচালানিরা এখন কৌশল বদল করে মাদক পাচার করে আনছে। ফেনসিডিল ও ইস্কপ পাচারে তারা পাইপ ব্যবহার করছে। কাঁটাতারের বেড়ার এক প্রান্তে এসব মাদকদ্রব্য ঢুকিয়ে দিয়ে অন্য প্রান্ত দিয়ে তারা বের করে আনছে। ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা এসব মাদকদ্রব্য সড়ক, রেল ও জলপথ দিয়ে পাচার হয়ে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে।

আখাউড়ার মাদকবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা সৈয়দ তানভীর শাহ মন বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া। কয়েক দিন আগে তারাগন গ্রামে মাদকবিরোধী সভায় এক মাদক ব্যবসায়ী উপস্থিত হয়ে তার কিছু মাদক আমাদের কমিটির লোকজন রেখে দেয় বলে অভিযোগ করে। প্রকাশ্যে এমন কথা বলার বিষয়টি জেনেও ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। ’

কসবা থানার ওসি মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘১০-১২ জন কারবারি এখানকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তবে আখাউড়ার রহিজ উদ্দিন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর এসব ব্যবসায়ী গা ঢাকা দিয়েছে। ’

আখাউড়া থানার ওসি মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘মাদক প্রতিরোধে দুটি এলাকায় লাঠি-বাঁশির কর্মসূচি নিয়ে সফলতা পাওয়া গেছে। ওই সব এলাকায় মাদকসেবীরা বিশেষ করে জেলা শহর থেকে মোটরসাইকেলে করে যারা আসত তারা এখন সাহস পায় না। যে কারণে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকাগুলোর মাদক ব্যবসা। ’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিদর্শক দেওয়ান মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে যে আগের চেয়ে এখন আমরা অনেক বেশি তৎপর। প্রতি মাসেই আমরা গড়ে অন্তত ১৫টি মামলা করছি। ’


মন্তব্য