kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঝিকরগাছায় ফুলের হাটে একের পর এক খুন

ফখরে আলম, যশোর   

১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



রজনীগন্ধার সুগন্ধ, গোলাপের বাহারি রং, জারবেরার সৌন্দর্যও খুনিদের মন গলাতে পারছে না। ফুলের হাটে গোলাপের পাপড়িকে রক্তাক্ত করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে।

ফুলচাষিদের রক্তে ভিজছে দেশের সবচেয়ে বড় ফুলের হাট যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী।

গত চার বছরে এখানে পাঁচ ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী খুন হয়েছে। ১৩ অক্টোবর খুন হন গদখালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, ফুলচাষি কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক যুবলীগ নেতা রাহাজ্জান সরদার। এর জের ধরে আলমগীর হোসেন নামের এক ট্রাকচালককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে গদখালী হাটের কালীবাড়ি মাঠ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি রাহাজ্জান খুনের ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে সোমবার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন আটক অন্য এক আসামি। আলমগীর ঝিকরগাছা উপজেলার শরীফপুর গ্রামের সিদ্দিক হোসেনের ছেলে।

পুলিশ জানায়, সোমবার রাতে গদখালী-শরীফপুর রাস্তার ধারে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে আলমগীর মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। খবর পেয়ে গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনাস্থলে একটি ওয়ান শুটারগান পাওয়া গেছে। এ ঘটনার আগে গত ৫ জুলাই রাহাজ্জান সরদারের বড় ভাই ফুলচাষি হাসান সরদারকে হত্যা করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গদখালী ফুলের হাটে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়। ফলে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের চোখ পড়ে এই হাটের ওপর। শুরু হয় আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। ২০১২ সালে খুন হন আওয়ামী লীগের কর্মী ফুলচাষি উমির আলী। ২০১৩ সালে হাটের নিয়ন্ত্রক গদখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রবিউল ইসলামকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বারের নামে মামলা হয়। একপর্যায়ে জব্বার, রাহাজ্জান সরদারের নামে চার্জশিট দেওয়া হয়। পুলিশ রাহাজ্জানকে আটক করে। জেল থেকে বের হয়ে এসে তিনি হাটের নিয়ন্ত্রণ নেন। এর আগে থেকেই তাঁর বড় ভাই হাসান সরদার হাট নিয়ন্ত্রণ করতেন। ফলে অন্য পক্ষের সঙ্গে তাঁর বিরোধ চলছিল। এরাই গত ৫ জুলাই বাড়িতে ঢুকে হাসানকে হত্যা করে। এই হত্যা মামলার বাদী ছিলেন রাহাজ্জান। গত ১৩ অক্টোবর সকাল ৯টার দিকে হাটের একটি সেলুনে রাহাজ্জানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় যুক্ত থাকার সন্দেহে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিনের বাড়িতে হামলা চালায় রাহাজ্জানের লোকজন। এর পর থেকে মহিউদ্দিন পলাতক।

রাহাজ্জানের স্ত্রী আছিয়া খাতুন বলেন, ‘স্বামী ও ভাশুর খুনের ঘটনায় আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। ছেলেমেয়েরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। ’ স্থানীয় ফুলচাষি কল্যাণ সমিতির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ‘গদখালীর ফুল আমাদের মান বাড়িয়েছে। কিন্তু এই বাজারের আধিপত্য নিয়ে অব্যাহত খুনের ঘটনায় আমাদের মাথা নিচু হয়ে গেছে। রাজনীতিতে যুক্ত স্থানীয় কয়েকজন হাট নিজেদের কবজায় রাখার জন্য রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠেছে। ’

এ ব্যাপারে গত সোমবার দুপুরে যোগাযোগ করা হলে ঝিকরগাছা থানার ওসি মাসুদ করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফুলের হাট নিয়ে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে বলে ধরে নিতে পারেন। কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে ধরা যায়নি। ’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, সোমবার ভোরে নাভারণ থেকে আলমগীর হোসেন নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তাঁর বাড়ি ঝিকরগাছার শরীফপুর গ্রামে। তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, ফুলের হাটের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে তাঁরা আটজন রাহাজ্জান হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। এই আলমগীরেরই লাশ পাওয়া গেল গতকাল।


মন্তব্য