kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্টের অভিমত

তারেকের পক্ষ নেন নিম্ন আদালতের বিচারক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



তারেকের পক্ষ নেন নিম্ন আদালতের বিচারক

বিদেশে অর্থপাচারের মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা করে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে গতকাল সোমবার। ৮২ পৃষ্ঠার এ রায়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করতে বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

নিম্ন আদালতের বিচারক সম্পর্কে রায়ে হাইকোর্টের অভিমতে বলা হয়েছে, যে যুক্তি দেখিয়ে আদালত তারেক রহমানকে খালাস দিয়েছেন, তা অনুমাননির্ভর। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিচারক নিজেই তারেক রহমানের পক্ষ অবলম্বন করেছেন। তারেক রহমান দোষী হওয়ার পরও তাঁকে খালাস দিয়ে আইন লঙ্ঘন করেছেন।

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, এ রায় এখন ঢাকার বিচারিক আদালতে যাবে। এরপর ওই আদালত তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করবেন। এই সাজা পরোয়ানার কপি পাওয়ার পর তা তামিল (কার্যকর) করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নেবে।

বিদেশে ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৬১৩ টাকা পাচারের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় নিম্ন আদালত তারেক রহমানকে খালাস দিয়ে যে রায় ঘোষণা করেছিলেন, তা বাতিল করে গত ২১ জুলাই রায় দেন হাইকোর্ট। দুদকের করা আপিল গ্রহণ করে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই দিন সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিলেন। ওই রায়ের মধ্য দিয়ে প্রথম কোনো মামলায় তারেক রহমানের সাজা হয়।

এ মামলায় তারেক রহমানের ব্যবসায়িক বন্ধু হিসেবে পরিচিত গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে নিম্ন আদালতের দেওয়া সাত বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। তবে তাঁকে নিম্ন আদালতের করা ৪০ কোটি টাকার অর্থদণ্ড কমিয়ে করা হয় ২০ কোটি টাকা। নিম্ন আদালতের সাজার বিরুদ্ধে মামুনের করা আপিল খারিজ করে ওই রায় দেন আদালত।

রায়ে বলা হয়, বিদেশে পাচার করা ২০ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করার আদেশ বাতিল করা হলো। কারণ সংশ্লিষ্ট আইনে বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত জরিমানার অর্থ আদায় না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত থাকবে। এ ছাড়া ওই অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকায় হোসাফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. মোয়াজ্জাম হোসেন, নির্মাণ কনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান খাদিজা ইসলাম, মায়ের সায়েরি ও মেরিনা জামানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে দুদককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

রায়ে হাইকোর্ট অভিমতে বলেন, ‘দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে তারেক রহমান এমন রাজনৈতিক শ্রেণির ব্যক্তি, যাঁর দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে তিনি সচেতনভাবে অর্থনৈতিক অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করে পরামর্শক ফি নামে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীর (সাজাপ্রাপ্ত গিয়াসউদ্দিন আল মামুন) মাধ্যমে ডার্টি মানি অর্জন করেছেন। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সংঘটিত এ ধরনের দুর্নীতি সুশাসন, টেকসই উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য হুমকিস্বরূপ। ’

অভিমতে বলা হয়, রাজনৈতিক ঢাল ব্যবহার করে এমন অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের প্রবণতা বাড়ছে। এখন সময় এসেছে, দেশের কল্যাণ ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এ ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে হওয়া দুর্নীতি রুখে দেওয়ার।

অভিমতে আরো বলা হয়, এটা উল্লেখ করা জরুরি যে দুর্নীতির চর্চা ও রাজনৈতিক প্রভাব তর্কাতীতভাবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অর্থপাচারের মতো অর্থনৈতিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে, যা গোটা সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অভিমতে বলা হয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অবৈধভাবে অর্থ অর্জনে অনৈতিক আনুকূল্য নেওয়ার প্রবণতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের অপরাধের নিন্দা করার জন্য এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বড় ধরনের সুসংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধ যেন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে সে জন্য সমাজকে সজাগ হতে হবে।

অভিমতে আরো বলা হয়, অর্থপাচারের মতো অর্থনৈতিক অপরাধে দেশের প্রত্যেক নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারেক রহমান অবৈধ উৎস থেকে উপার্জিত বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ পাচারের জন্য দোষী। সচেতনভাবে তিনি এ ধরনের অর্থনৈতিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এটি নমনীয় দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। এ কারণে দেশের চলমান অর্থনৈতিক উন্নতির স্বার্থে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ অর্জন করার উপায় ও উৎস গোপন করে অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে যথাযথ শাস্তি প্রদান করা দরকার।

বিদেশে ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৬১৩ টাকা পাচারের অভিযোগে ২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলাটি করেছিল দুদক। ওই মামলায় ঢাকার একটি আদালত ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর এক রায়ে তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন। তবে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। পাচার করা ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৬১৩ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সে বছরের ৫ ডিসেম্বর আপিল করে দুদক। একই সঙ্গে কারাবন্দি মামুনও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি এ আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে তারেক রহমানকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের আদেশ দেন হাইকোর্ট। এরপর আপিলটি হাইকোর্টের কার্যতালিকায় এলে গত ১২ জানুয়ারি তারেক রহমানকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২০ ও ২১ জানুয়ারি দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিষয়টি অবহিত করা হয় আদালতকে। সমনের নোটিশ তারেক রহমানের কাছে পৌঁছানোর তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে পলাতক দেখিয়ে বিচার করেন উচ্চ আদালত।


মন্তব্য