kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বেপরোয়া শিবগঞ্জের ইউএনও নেপথ্যে স্থানীয় এমপির দাপট

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বেপরোয়া শিবগঞ্জের ইউএনও নেপথ্যে স্থানীয় এমপির দাপট

বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বাণিজ্য, অনিয়ম-দুর্নীতি এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ ইরতিজা আহসানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় এক বছর আগে শিবগঞ্জের ইউএনও পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হয়েছেন।

এরপর তাঁকে সব মিলিয়ে চারবার বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সব বদলির আদেশ তিনি অগ্রাহ্য করে ইউএনও হয়েই এখনো বহাল তবিয়তে আছেন শিবগঞ্জে।   স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এমপি গোলাম রাব্বানীর দাপট ও আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকেই অনিয়ম দুর্নীতি আর ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন ইউএনও।

এ ছাড়া রাজশাহীর আরো কয়েকজন ইউএনওর বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ তুলে স্থানীয় জনসাধারণ বিভাগীয় কমিশনারসহ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। কাউকে কাউকে ডেকে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ভর্ত্সনা করা হয়েছে মাত্র। কিন্তু এখনো তাঁরা রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে। আর এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে চরম ক্ষোভ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ইউএনও সৈয়দ ইরতিজা আহসানের বিরুদ্ধে। ইউএনও থেকে পদোন্নতি পাওয়ার পর এরই মধ্যে তাঁর অন্তত চারবার বদলির আদেশ এসেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি নিজের এবং স্থানীয় এমপি গোলাম রাব্বানীর ক্ষমতার দাপটে টিকে আছেন শিবগঞ্জেই। গত ১৮ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব রেদোয়ান আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বদলি আদেশ আসে শিবগঞ্জে। চিঠিতে গত ২১ জুলাইয়ের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করতে বলা হয় সৈয়দ ইরতিজা আহসানকে।

অভিযোগ উঠেছে, সরকারি এই আদেশ লঙ্ঘন করে স্থানীয় এমপি গোলাম রাব্বানীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এখনো শিবগঞ্জ উপজেলার ইউএনও হিসেবে স্বপদে বহাল রয়েছেন তিনি। এই ইউএনওর বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ তুলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার এবং স্থানীয় জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিক অভিযোগও করা হয়। এ ছাড়া বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিতে ইউএনওকে এমপি গোলাম রাব্বানী প্ররোচিত করেছেন বলেও অভিযোগে বলা হয়। প্ররোচিত হয়ে ইউএনও ইউপি নির্বাচনে ফলাফল জালিয়াতি করেছেন বলেও অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।  

স্থানীয় উজিরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি দুরুল হুদা অভিযোগ করে বলেন, ‘এমপির আশ্রয়ে থেকে ইউএনও সৈয়দ ইরতিজা আহসান ইচ্ছামতো অফিসে আসেন। ইচ্ছা হলে অফিস করেন, না হলে করেন না। ফলে তাঁর কাছে নানা বিষয়ে কাজকর্মে গিয়েও সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়। আবার বিগত নির্বাচনে এমপি রাব্বানীর কথামতো ইউএনও নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিপক্ষে কাজ করিয়েছেন। কোনো প্রার্থীর বিপক্ষে ফলাফলও জালিয়াতিতে ভূমিকা রেখেছেন ইউএনও। ’

অভিযোগ উঠেছে, ওই বদলির পরে তাঁকে সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলি করা হয়। এ ছাড়া গত বছরের ৯ নভেম্বর ইউএনও থেকে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে সৈয়দ ইরতিজা আহসানকে রাজবাড়ী জেলায় বদলি করা হয়। কিন্তু সেটিও তিনি কানে না তুলে শিবগঞ্জেই থেকে যান।  

আরেকটি সূত্র অভিযোগ করে, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে যে চাঁদা উত্তোলন হয়, তার একটি বড় অংশের ভাগ পান স্থানীয় এমপি গোলাম রাব্বানী ও ইউএনও সৈয়দ ইরতিজা আহসান। এই ভাগের অর্থের লোভেই এখনো শিবগঞ্জ ছাড়তে চাচ্ছেন না ইউএনও।  

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে পদোন্নতি পেতে যখন ইউএনওরা লালায়িত থাকেন, তখন পদোন্নতি পেয়েও তিনি এখনো প্রায় এক বছর ধরে সেই পদে যোগদান করেননি। বিষয়টি নিয়েই নানা জল্পনা-কল্পনা দেখা দিয়েছে খোদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও। এসব কারণেই তাঁকে স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ করা হয় জনপ্রশাসন বিভাগ থেকে। কিন্তু সেটিও ইউএনও সৈয়দ ইরতিজা আহসানের দাপট ও স্থানীয় এমপি গোলাম রাব্বানীর প্রভাবের কাছে ব্যর্থ হয়ে যায়।   

ইউএনও সৈয়দ ইরতিজা আহসানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বদলির আদেশটি স্থগিত হয়েছে বলে দাবি করেন। কবে স্থগিত হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেভাবে কোনো চিঠি দিয়ে হয়নি, তবে স্থগিত হয়েছে বলে শুনেছি। ’

তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ তো উঠতেই পারে। তাহলে কি সবই সত্য? এগুলোর কোনো ভিত্তি নাই। ’ এমপি রাব্বানীর সঙ্গে কথা বলতে গতকাল তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে গত ১৩ জুলাই স্থানীয় পত্রিকায় অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হলে পত্রিকা বিক্রেতা উৎপলকে পিটিয়ে থানায় দেওয়া হয়। পরে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দিনের হস্তক্ষেপে ইউএনও উৎপলকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেন।

ওই দিন জেলা প্রশাসক নিজে ইউএনওকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে ভর্ত্সনাও করেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। ইউএনও নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় লোকজনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগও করা হয়েছে।

এদিকে পুঠিয়ার কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যত অবৈধ কারবারি রয়েছে, তাদের সঙ্গে ইউএনওর সখ্য চরমে। তাদের সঙ্গে নিয়ে ইউএনও নুরুজ্জামান দাপট দেখিয়ে বেড়ান এলাকায়। নিয়মিত অফিস না করে তিনি গাড়ির সাইরেন বাজিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়ান। উপজেলার খাসপুকুর লিজ দেওয়া, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে জোর করে কমিশন আদায় করাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। ইউএনওর দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রতি দুজন সরকারি কর্মকর্তা পুঠিয়া থেকে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। বদলির সময় তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ইউএনওর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে পুঠিয়ায় চাকরি করা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন। এ ছাড়া উপজেলা খাদ্য অধিদপ্তরের আরো এক কর্মকর্তা একই অভিযোগ তুলে এরই মধ্যে বদলির জন্য নানাভাবে তদবির করছেন।

ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেকোনো প্রকল্প এলেই ইউএনও আগেভাগেই কমিশন চেয়ে বসে থাকেন। আবার কমিশন না দিলে তিনি কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করতে চান না। ’

উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউএনওকে টাকা না দেওয়ায় তিনি কৃষকদের সারের ভর্তুকির প্রায় ১০ লাখ টাকার চেক আটকে দেন। শেষে বিষয়টি স্থানীয় এমপি কাজী আব্দুল ওয়াদুদ পর্যন্ত গড়ালে তাঁর হস্তক্ষেপে ইউএনও পরে চেক ছাড় করতে রাজি হন। তবে এখনো চেক না পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে ওই টাকা বিতরণ করা যায়নি বলেও সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।    

এসব নিয়ে জানতে চাইলে ইউএনও নুরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানকার একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। তবে আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। এসবের কেউ কোনো প্রমাণও দিতে পারবে না। ’

উপজেলা কৃষি অফিসের ভর্তুকির সারের টাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কৃষকরা ঠিকমতো ওই টাকা পাচ্ছেন কি না সেটি খোঁজ নিতে চেয়েছি। টাকা আটকে রাখার কোনো প্রশ্নই আসে না। ’

এদিকে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তারুন নাহারের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে উপজেলা সদরের ব্যবসায়ীরা ইউএনও আক্তারুন নাহার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাজিবুল ইসলাম খানের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে। উত্তেজিত ব্যবসায়ীরা ইউএনওর কার্যালয় লক্ষ করে ইটপাটকেলও ছোড়ে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ অভিযোগ করে বলেন, ‘দুর্গাপুরের ইউএনওর বিরুদ্ধে পুকুর খননের নামে ব্যাপক অভিযোগ করেছে স্থানীয় লোকজন। বিষয়টি নিয়ে আমরাও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ’

তবে ইউএনও আক্তারুন নাহারের ফোনে গতকাল কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। সূত্র আরো জানায়, এই তিন ইউএনও ছাড়াও আরো কয়েকজন ইউএনওর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের বিরুদ্ধেও জেলা প্রশাসক ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ এসেছে স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে। কিন্তু এখনো বহাল তবিয়তে আছেন অভিযুক্ত ইউএনওরা।  

এসব বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল হান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েকজন ইউএনওর বিরুদ্ধে আমাদের কাছেও অভিযোগ আসছে। সেগুলোর অভ্যন্তরীণ তদন্তও হচ্ছে। তদন্ত শেষে কারো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে বদলিও করা হচ্ছে। ’

আরেক প্রশ্নের জবাবে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘এখনো অভিযোগ আসছে, সেগুলো আমরা গোপনে তদন্ত করছি। অভিযোগ পেলে অন্যদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য