kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আবারও সাইবার ক্রাইমের শিকার ফায়যুর!

সিলেট অফিস   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



দেশের বিশিষ্টজনদের মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় আবারও ‘বিপদে’ পড়েছেন সিলেটের শিক্ষার্থী ফায়যুর রাহমান। এর আগে এ ধরনের ঘটনায় দুইবার ফায়যুর গ্রেপ্তার হলেও তিনি যে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন সেটি প্রকাশ পায় হুমকির ঘটনার মূল হোতা আবদুল হককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করার পর।

বর্তমানে আবদুল হক কারাগারে থাকলেও তাঁর সহযোগীরা ফায়যুর রাহমানের সিম ক্লোন করে এসব করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত দুই দিনে জনপ্রিয় লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হক, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সব কটি হুমকিই একই মোবাইল ফোন নম্বর থেকে দেওয়া হয়। এই মোবাইল ফোন নম্বর ফায়যুর রাহমানের।

তবে নিজের মোবাইল ফোন থেকে এ ধরনের কোনো খুদে বার্তা তিনি পাঠাননি দাবি করে কালের কণ্ঠকে ফায়যুর রাহমান বলেন, তিনি আবারও ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন।

বিষয়টি লিখিতভাবে মহানগর পুলিশ কমিশনারকে গতকাল শনিবার জানিয়েছেন বলে ফায়যুর জানান। তিনি বলেন, ‘যারা আমাকে বারবার এই হেনস্তা করছে, আমি তাদের বিচার চাই। আমি এই ভোগান্তি থেকে  রেহাই চাই। ’ সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ জানান, ফায়যুর রাহমানের একটি লিখিত আবেদন তাঁরা পেয়েছেন। এতে হুমকি দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরটি তাঁর জানিয়ে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর প্রতিকারও চেয়েছেন।

জানা যায়, ফায়যুর রাহমানের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গাংপার নোয়াকোট গ্রামে। মেধাবী ফায়যুর রাহমান কোরআনে হাফেজ। এ ছাড়া তিনি সিলেটের একটি মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান ফায়যুর লেখাপড়ার পাশাপাশি সিলেটের স্থানীয় দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। তিনি সাহিত্যচর্চাও করতেন। ফায়যুর ও তাঁর সমমনা কয়েকজন মিলে ২০০৭ সালে সিলেটে ‘মুক্তস্বর’ নামের একটি ভিন্নধর্মী সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। প্রতি সপ্তাহে মুক্তস্বরের সাহিত্য আসর বসত। মূলত মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সাহিত্য সংস্কৃতিসেবীদের সাহিত্যের মূলধারায় নিয়ে আসাই ছিল মুক্তস্বরের উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে ফায়যুরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী আবদুল হকের বাড়িও সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার একই গ্রামে। ফায়যুর বলেন, “আবদুল হকের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। সে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আমাদের ‘মুক্তস্বর’ সংগঠনটি ছিল জামায়াতের চিন্তা-চেতনার পরিপন্থী। আবদুল হক সেখানে জামায়াতি চিন্তা-চেতনা বপনের চেষ্টা করে। এ নিয়ে একপর্যায়ে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। ফলে তার সঙ্গে বিরোধ বেড়ে যায়। এর পর থেকে মোবাইল ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে সে আমার ফোন নম্বর ব্যবহার করে একাধিকবার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার হুমকিসংবলিত এসএমএস পাঠিয়েছে। আর এর জন্য আমাকে গ্রেপ্তার ও জেল খাটতে হয়েছে। আমার লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পথে। ”

২০১৩ সালের ১৪ জুন পুলিশ এই ফায়যুর রাহমান ও আবদুল মালেক ভূঁইয়া নামের আরেক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে। ফায়যুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তিনি অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীসহ ছয়জন সংসদ সদস্যকে হত্যার হুমকি দিয়ে তাঁর মোবাইল ফোন থেকে খুদে বার্তা পাঠিয়েছেন। পরদিন সিলেট মহানগর পুলিশ ফায়যুরকে সংবাদমাধ্যমের সামনে হাজির করে ঘটনাটি জানায়। তাঁকে হুমকিদাতা হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু আদালতে সোপর্দ করার সময় ফায়যুরের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ (হুমকি) না এনে একটি খেলনা পিস্তল ও তিনটি তাজা গুলি দিয়ে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। পুলিশ বাদী হয়ে দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি মামলা দায়ের করে। এ মামলায় ফায়যুর চার মাস জেল খাটেন। আবদুল মালেকও একই মামলায় জেল খাটেন। তিনি সিলেট পলিটেকনিট ইনস্টিটিউটের ছাত্র।

দ্বিতীয়বার ফায়যুর রাহমান গ্রেপ্তার হন ২০১৪ সালের ৩০ জুন। রাতে নগরের বাদামবাগিদা এলাকা থেকে র‍্যাব-৯-এর একটি দল তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এবার অভিযোগ আনা হয়, তিনি আইনমন্ত্রীকে খুদে বার্তার মাধ্যমে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় সিলেট মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানায় মামলা করা হয়। এ মামলায় তিনি দ্বিতীয় দফা আরো ছয় মাস কারাহাজতে ছিলেন। মামলাটি তদন্ত করেন সিলেট মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক শিবেন্দ্র চন্দ্র দাশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তিনি অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। গত বছরের ১৭ নভেম্বর আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন।

তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, যে মোবাইল ফোন থেকে হুমকির খুদে বার্তাটি পাঠানো হয়েছে তা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) প্রতিবেদনও জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা শিবেন্দ্র। বিটিআরসি তাদের প্রতিবেদনে বলে, এই মোবাইল ফোন নম্বর থেকে আইনমন্ত্রীর মোবাইল ফোনে কোনো খুদে বার্তা পাঠানো হয়নি।

মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিকসহ  দেশের ১৫৩ জন বিশিষ্ট নাগরিককে হত্যার হুমকির অভিযোগে ‘সাইবার জঙ্গি’ আবদুল হককে গত বছরের ২৪ নভেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। আর তাঁর বন্ধু আমিনুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় ওই বছরের ২৭ নভেম্বর। এরপর ডিবির পরিদর্শক শাহ মো. আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস বাদী হয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে আবদুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ মামলায় দুই দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে ২ ডিসেম্বর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আবদুল হক ও তাঁর সহযোগী আমিনুর রহমান। সেই জবানবন্দিতে দেশের অন্যান্য বিশিষ্ট নাগরিককে হুমকির পাশাপাশি আইনমন্ত্রী আনিসুল হককেও হত্যার হুমকি দেওয়ার কথা স্বীকার করেন আবদুল হক।

আবদুল হক আদালতের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, ‘সিলেট শহরে আমি আমার বন্ধু প্রতিবেশী ফায়যুর ও নোমান তিনজন মিলে মুক্তস্বর সাংস্কৃতিক ফোরাম নামের একটি সাহিত্য ফোরাম গঠন করি। পরবর্তী সময়ে ফায়যুরের সঙ্গে আমার বিরোধ দেখা দেয় এবং বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। আমি তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি প্রবল আগ্রহী। সেই সুবাদে প্রযুক্তিগত উপায়ে ফায়যুরকে শায়েস্তা করতে উপায় খুঁজতে থাকি। পরে আমি আবিষ্কার করি, অন্যের মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করে এসএমএস পাঠানো যায়। এতে আমি সফল হই। পরে ফায়যুর ও তার সহযোগী ফুয়াদের নম্বর ব্যবহার করে আমি অর্থমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হুমকিমূলক বার্তা পাঠাই। ’

অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক সনৎ দেব উল্লেখ করেন, “আবদুল হক জানতে পারে যে বিনু নামের একটি অ্যাপসসহ অন্যান্য ‘স্ফুফিং’ দ্বারা অন্যের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে বার্তা পাঠানো সম্ভব। যে মোবাইল সিম নম্বর ব্যবহার করে বার্তা পাঠানো হয়  সেই মোবাইল সিম নম্বরে বার্তার একটা পিন নম্বর যায়। সেই পিন নম্বর সংগ্রহ করে বিনু অ্যাপসের মাধ্যমে অন্যের মোবাইল সিম নম্বর ব্যবহার করে বার্তা পাঠানো সম্ভব। পরে আসামি আমিনুর রহমানকে আবদুল হক বিষয়টি খুলে বলে। আমিনুর ফায়যুরের মোবাইলের পিন নম্বর সংগ্রহ করে। এরপর আবদুল হক সেই পিন নম্বর নিয়ে বিনু অ্যাপসসহ অন্যান্য ‘স্ফুফিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যার হুমকি দিয়েছে। ”

গত ৩১ মার্চ আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। বর্তমানে মামলাটি বিচার পর্যায়ে। এ মামলার প্রথম সাক্ষী ফায়যুর রাহমান।


মন্তব্য