kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সুজনের গোলটেবিল বৈঠক

ইসি নিয়োগে সব রাজনৈতিক দলকে সম্পৃক্ত করার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



রাজনৈতিক বিতণ্ডা এড়াতে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) নিয়োগের ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলকে সম্পৃক্ত করার দাবি জানিয়েছেন ‘সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক’ নেতারা। তাঁরা সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে নিয়োগসংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়নেরও দাবি জানান।

গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা এ দাবি জানান।

সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় অংশ নেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজন নির্বাহী সদস্য ড. হামিদা হোসেন, ড. শাহদীন মালিক, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আলী ইমাম মজুমদার, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, রাজনীতিবিদ শেখ শহিদুল ইসলাম, এ এস এম আকরাম, হুমায়ূন কবীর হিরু, সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ।

বৈঠকে এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, ‘আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থার অভাব রয়েছে। যে কারণে কোনো নির্বচনে যাঁরা হেরে যান তাঁরা কারচুপির অভিযোগ আনেন। তাই নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার অভাব নিরসন করতে হবে এবং নির্বাচনী ফলাফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘অনেক দেশেই রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন কমিশন গঠিত হলে কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে কারো কোনো আপত্তি থাকে না। ’ যাঁদের বিরুদ্ধে দলপ্রীতির অভিযোগ নেই এবং যাঁদের সুনাম রয়েছে তাঁরাই নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন অপরিহার্য। তবে নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে কিভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা নিয়ে কথা বলা দরকার। ’ মূলত প্রধানমন্ত্রী চাইলেই দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ কিভাবে নিশ্চিত হতে পারে এ নিয়ে রাষ্ট্রপতি সব দলের অংশগ্রহণে আলোচনার সূত্রপাত করতে পারেন। ’ নির্বাচনী পরিবেশ ঠিক হয়ে গেলে নির্বাচনী ম্যাকানিজম নিয়ে পরে আলোচনা করা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচন কমিশন হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মূল কেন্দ্র। তা ছাড়া কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সাধারণত কর্তৃত্ববাদী সরকার গঠিত হয়। ’ তিনি বলেন, ‘সকলের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠিত হলে তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ’ তবে আইনের মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশন গঠন হওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা হলো গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নির্বাচন। তাই আমরা একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। ’

মূল প্রবন্ধে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তথা জেনুইন ইলেকশন পরিচালনার জন্য একটি সঠিক প্রতিষ্ঠান আবশ্যক। এ লক্ষ্যে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে ‘আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে’ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচন কমিশনে কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার জন্য একটি আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত ৪৪ বছরেও তা মানা হয়নি। তাই সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী আইন প্রণয়ন না করে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদান করা না হলে, সেই নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ” এ ক্ষেত্রে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত গত নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত নিয়োগ-সংক্রান্ত আইনের একটি খসড়া কাজে লাগানো যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো মূলত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মানদণ্ড ও কর্মের শর্তাবলি নির্ধারিত করে দেওয়া। যাতে জেনুইন বা সঠিক নির্বাচনের জন্য সঠিক ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠিত হয়। অতীতে সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সঠিক ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগ না দেওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। ’

ড. মজুমদার আরো বলেন, ‘ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বাগিবতণ্ডা এড়ানোর লক্ষ্যে আমরা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের কমিটির সদস্য করার প্রস্তাব করছি। একই সঙ্গে অনুসন্ধান কমিটির নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে আমরা এতে নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব করছি। অনুসন্ধান কমিটিকে অবশ্যই স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। স্বচ্ছতার খাতিরে কমিটি নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দানের জন্য জনগণের কাছে নাম সুপারিশের আহ্বান করতে পারে।

এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে কাজ করছে না। মূলত সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দরকার স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের সদিচ্ছা। ’ তিনি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি জানান।

ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘আইন প্রণয়ন করা ছাড়া নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলে তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে যাঁরা শপথ গ্রহণ করবেন তাঁদের আইনি ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। ’ তিনি বলেন, ‘সার্চ কমিটিতে বিচারপতিদের না রাখাই ভালো। কারণ তাঁদের কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকে না। ’

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থাহীনতা রয়েছে। জনগণের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে সরকার যোগ্য ব্যক্তিদের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবে কি না। এ ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হয়ে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। ’ সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি ও রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দানে পরামর্শ দিতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন চাই। কিন্তু শুধু নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা। ’ তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলেও সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে গঠিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গোলটেবিল বৈঠকে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের যুক্ত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন ড. হামিদা হোসেন।


মন্তব্য