kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আশুলিয়ায় সাবরেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকরা মুখোমুখি

তিন সপ্তাহ ধরে দলিল রেজিস্ট্রি বন্ধ, দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ

আপেল মাহমুদ   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ঢাকার পাশে আশুলিয়ায় সাবরেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকদের দ্বন্দ্বে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। তিন সপ্তাহের বেশি সময় সেখানে রেজিস্ট্রি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

ফলে প্রায় পাঁচ হাজার দলিলের স্তূপ জমেছে। এতে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সাবরেজিস্ট্রার গাজী হানিফ দলবল নিয়ে অফিস করছেন। দুই পক্ষকে সেখানে শক্তির মহড়া দিতেও দেখা গেছে। তাদের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে যেকোনো সময় অপ্রীতিকর কিছু ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দলিল লেখকরা অভিযোগ করেন, ওই অফিসে যোগদান করেই সাবরেজিস্ট্রার দলিলপিছু মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। ঘুষ না দিলে তিনি দলিল লেখকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এমনকি এজলাস থেকে দলিল ছুড়েও ফেলে দেন। এসবের প্রতিবাদ করলে তিনি বলেন, এক কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি ওই অফিসে বদলি হয়ে এসেছেন। ঘুষ না খেলে তাঁর পোষাবে না।

অন্যদিকে সাবরেজিস্ট্রার গাজী হানিফ বলেন, ‘দলিল লেখকদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। জাল কাগজপত্র দিয়ে এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে দলিল রেজিস্ট্রিতে বাধা দেওয়ায় তাঁরা আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। তাঁরা দলিল লেখা বন্ধ করে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে নানা কুৎসা রটাচ্ছেন। এতে আমি কোনোভাবেই ভীত নই। নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই আমি আমার সঙ্গে কয়েকজন আত্মীয়স্বজন নিয়ে অফিস করছি। ’

ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মো. আবদুল জলিল বলেন, ‘দুই পক্ষকে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করা হয়েছে। দলিল লেখক সমিতির নেতারাও তাঁদের নিয়ে একাধিকবার বসেছেন। কিন্তু এক পক্ষ অন্য পক্ষকে না মানলে তো আর কারো কিছু করার থাকে না। এ কারণে দুই পক্ষকে আইজিআর (ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন) অফিসে গিয়ে মীমাংসা করার জন্য বলা হয়। সেখানে কয়েক দিন বসার পরও এর সুরাহা করা যায়নি। ’

১০৬ জন দলিল লেখকের সই করা অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মুজিবনগর সরকারের ভুয়া সনদ দিয়ে ২০০৩ সালে সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি নেওয়ার পর থেকেই গাজী হানিফ বেপরোয়া আচরণ শুরু করেছেন। যে অফিসে বদলি হয়েছেন সে অফিসেই তিনি গণ্ডগোল পাকিয়েছেন। এ কারণে কোথাও তিনি মেয়াদ অনুযায়ী চাকরি করতে পারেননি। সিলেট সদরে বদলি হলে সেখানে তিনি এক দিনের বেশি চাকরি করতে পারেননি। প্রতিটি অফিসেই তাঁর বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, সাবরেজিস্ট্রার প্রতিদিন একটি মাইক্রোবাসে (নম্বর-ঢাকা মেট্রো-চ-১৩-৯০২৪) করে ১০-১২ জন বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে অফিসে যান। তাদের মধ্যে তাঁর আপন ভাই বায়েজিদ গাজী ও চাচাতো ভাই আলামিন গাজী পুরো অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁদের কথামতো দলিল রেজিস্ট্রি হয়। বায়েজিদ গাজী নিজেই কমিশনে দলিল করে থাকেন। আলামিন গাজী দলিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ছাড়পত্র দিলে তবেই সাবরেজিস্ট্রার সেই দলিল রেজিস্ট্রির কাজ সম্পন্ন করেন। নয়তো রেজিস্ট্রি করেন না।

অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ রয়েছে, হেবা, দানপত্র কিংবা বন্ধকী দলিলের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ না পেলে তা রেজিস্ট্রি করেন না সাবরেজিস্ট্রার। ভুল সংশোধনী দলিলের ক্ষেত্রে এক থেকে দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন তিনি। জোতের বা পৈতৃক সম্পত্তিতে অংশ উল্লেখ থাকলেও তা রেজিস্ট্রির সময় তিনি বাটোয়ারা দলিল দেখতে চান। ১০টির বেশি দলিল হলে তিনি সরাসরি বলে দেন, এক দিনে এত দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারবেন না। দলিল রেজিস্ট্রির পর একটির বেশি নকল চাইলে তিনি তা দেন না। কেউ এর প্রতিবাদ করলে তিনি বলেন, তাঁর অফিসে কোনো দলিল লেখকের প্রয়োজন নেই। দলিলের দাতা-গ্রহীতা এলেই তিনি দলিল রেজিস্ট্রি করে দেবেন।

আশুলিয়া দলিল লেখক সমিতির সভাপতি তালুকদার তাজুল ইসলাম বলেন, ‘গত মাসের ১৯ তারিখে যোগদানের পর তিনি এক দিনও স্বাভাবিকভাবে অফিস করতে পারেননি। তাঁর আচরণের কারণে গত মাসের ২২ তারিখ থেকে দলিল রেজিস্ট্রি পুরোপুরিভাবে বন্ধ রয়েছে। এই সাবরেজিস্ট্রার যত দিন এখান থেকে বদলি না হবেন তত দিন আমরা দলিলের মুসাবিদা করব না। প্রকাশ্যে ঘুষ দাবি করেন এমন সাবরেজিস্ট্রার আমরা চাই না। ’

আশুলিয়া দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ৪০ বছর ধরে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ করছি। কিন্তু বর্তমান সাবরেজিস্ট্রারের মতো এমন দুর্নীতিবাজ সাবরেজিস্ট্রার কখনো দেখিনি। তিনি একেক দলিলে একেক রকম ঘুষ দাবি করছেন। কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। এ কারণে অনেকটা নিরুপায় হয়ে আমরা তাঁর অপসারণ চেয়ে দলিল মুসাবিদা করা বন্ধ রেখেছি। বর্তমানে আমাদের একটাই দাবি, দুর্নীতিবাজ ও অপ্রকৃতিস্থ সাবরেজিস্ট্রারের অপসারণ চাই। ’


মন্তব্য