kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কারখানা বন্ধ হলে ‘লাভের’ মুখ দেখেন কর্মকর্তারা!

২২ মাস অচল সিইউএফএল, ইচ্ছা করেই যান্ত্রিক ত্রুটি না সারানোর অভিযোগ

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় ২২ মাস ধরে বন্ধ চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল)। আমদানিকারকদের স্বার্থ রক্ষায় দীর্ঘ সময় কারখানাটি বন্ধ রাখা হচ্ছে কি না, এ প্রশ্ন উঠেছে।

কারণ যান্ত্রিক ত্রুটি সারাতে নতুন রি-অ্যাক্টর কেনার অনুমোদন দেওয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে কেনা হচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির শুধু উৎপাদন ক্ষতি এক হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। এ সময়ে বেতন-ভাতায় খরচ হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। আর সার আমদানি করতে গিয়ে সরকারকে প্রতি টনে ন্যূনতম ৯ হাজার টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। অথচ সিইউএফএল সরকারকে দিতে পারত বছরে পাঁচ লাখ টন সার।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরশেনের (বিসিআইসি) সার কারখানাগুলো বছরের পর বছর উৎপাদন বাবদ লোকসান দিলেও সেদিকে নজর নেই কর্তৃপক্ষের। কর্তারা ব্যস্ত সার আমদানি নিয়ে। সার আমদানি করতে একটি চক্র ‘যান্ত্রিক ত্রুটি দীর্ঘায়িত’ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া বিসিআইসি ও সিইউএফএলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বেসরকারি সার কারখানার ‘বিশেষ সম্পর্কে’র কারণেও সরকারি সার কারখানা বন্ধ থাকতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।  

জানা গেছে, বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন আটটি সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে চালু আছে মাত্র একটি। এর মধ্যে বেশির ভাগই গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। যমুনা সার কারখানা ছাড়া ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী সব কারখানাই বন্ধ। গ্যাস সংকটের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলেও বন্ধ নেই বহুজাতিক কম্পানি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কম্পানি লিমিটেড (কাফকো)।

এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইলে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবু তাহের ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। এমনকি কেন রি-অ্যাক্টর কেনা হচ্ছে না, তা জানাতেও অস্বীকৃতি  জানান। তিনি বিসিআইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানান, গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইউরিয়া সার আমদানি হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ টন। প্রতি টন ইউরিয়া সার আমদানি করতে খরচ পড়েছে গড়ে ন্যূনতম ৩০০ মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার টাকা। অথচ বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের বাজার দর হচ্ছে প্রতি টন ১৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ ইউরিয়া সার আমদানি বাবদ অতিরিক্ত অর্থ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে । গত অর্থবছরে ৪৩২ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছে। দৈনিক এক হাজার ৭০০ টন উৎপাদন ক্ষমতার চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানায় সর্বশেষ উৎপাদন হয়েছে দিনে এক হাজার ৫০০ টন করে। প্রতিবছর এ কারখানায় প্রায় পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া সার উৎপাদিত হয়। আশুগঞ্জ, ঘোড়াশাল, পলাশসহ সব ইউরিয়া সার কারখানা চালু থাকলে দেশে ইউরিয়া সার আমদানি করতে হতো না। উল্টো সার উদ্বৃত্ত থাকত বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সিইউএফএলের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী প্রতি টন ইউরিয়া সারের মূল্য ১৪ হাজার টাকা। সেই হিসাবে গত ২২ মাস সিইউএলএল বন্ধ থাকায় উৎপাদন বাবদ ক্ষতি হয়েছে প্রায় এক হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলেন, এক টন ইউরিয়া সার আমদানি করতে সাড়ে ২৩ হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের দাম হচ্ছে প্রতি টন ১৪ হাজার টাকা।

সিইউএফএলের প্রকৌশলীরা জানান, চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি। প্রথম দিকে গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকলেও পরে কারখানার রি-অ্যাক্টর বিকল হয়ে পড়ায় তা আর চালু করা সম্ভব হয়নি। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশি প্রকৌশলীদের ব্যবস্থাপনায় রি-অ্যাক্টরটি মেরামতের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। পরে নতুন রি-অ্যাক্টর কেনার অনুমোদন দেয় বিসিআইসি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. ইকবাল পদাধিকার বলে সিইউএফএল পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি বিসিআইসিতে যোগদানের পর গত দুই বছরে সিইউএফএল পরিচালনা বোর্ডের ২৪টি সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি মিটিং আয়োজন করতে কর্তৃপক্ষের ৮০ হাজার টাকা খরচ হলেও বোর্ড মিটিংয়ের সিদ্ধান্তগুলোর অধিকাংশ আলোর মুখ দেখে না। ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রি-অ্যাক্টর কেনার অনুমোদনও তেমন একটি সিদ্ধান্ত, যা আলোর মুখ দেখেনি।

সিইউএফএলের প্রকৌশলীরা আরো জানান, অতীতে কখনোই এত দীর্ঘ সময় সিইউএফএল বন্ধ ছিল না। এ কারখানাটিতে তিন মাস সার উৎপাদন অব্যাহত থাকলে পুরো বছরের খরচ উঠে আসে। কিন্তু বিসিআইসির কিছু অসাধু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে সার কারখানাগুলো অচল করে রেখেছেন নিজেরা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার জন্য। বর্তমান সরকারের নীতি শিল্পবান্ধব হলেও বিসিআইসির কর্মকর্তারা চলেন উল্টোপথে। আমদানিকারকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সার আমদানিতে মনোযোগ বেশি বিসিআইসি কর্মকর্তাদের।

 


মন্তব্য