kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দলীয় নেতাদের শেখ হাসিনা

আর কত, নতুন নেতা নির্বাচন করেন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আর কত, নতুন নেতা নির্বাচন করেন

দলীয় নেতাদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘৮১ থেকে ২০১৬; ৩৫ বছর। আর কত? নতুন নেতা নির্বাচন করেন।

দলটা আরো সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে যাক। বঙ্গবন্ধু চারা রোপণ করেছিলেন, তা মহীরুহ হয়ে এত বড় হয়েছে। কাজেই ভবিষ্যতের জন্য আপনারাই সে নতুন চারা রোপণ করেন এবং দলকে আরো সংগঠিত করেন, সেটাই আমরা কামনা করি। ’ তিনি গতকাল সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সভার সূচনা বক্তব্যে এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনে দলের জন্য নতুন নেতা নির্বাচনে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘আমরা এটাই চাই, আওয়ামী লীগ তার ঐতিহ্য রক্ষা করবে। নতুন নেতা নির্বাচিত করবে। ’

১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দলের ১৩তম সম্মেলনে বিদেশে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে সভাপতি করা হয়। এর পর থেকে টানা এ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি। ১৯৯১ সালে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর দলীয় সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও নেতাকর্মীদের চাপে তিনি দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। সম্প্রতি ৭০-এ পা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অন্য সদস্যদের দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত করার পক্ষে। এবারই প্রথম শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা হোসেন পুতুল, ভাগ্নে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিকে কাউন্সিলর করা হয়েছে।

দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সব সদস্য, প্রতিটি সাংগঠনিক জেলা থেকে মনোনীত বা নির্বাচিত একজন করে সদস্য এবং সভাপতি মনোনীত ২১ জন সদস্য নিয়ে আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটি গঠিত। এ কমিটির মোট সদস্যসংখ্যা ১৬৬ জন।

শেখ হাসিনা জাতীয় কমিটির সভার সূচনা বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘অবৈধভাবে যারা ক্ষমতায় এসেছে, জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, যুদ্ধাপরাধী এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মদদ দিয়েছে, পুরস্কৃত করেছে, তাদের মুখ থেকে আবার গণতন্ত্রের ছবক শুনতে হয়। এর থেকে দুঃখের আর কী আছে? কোনো জায়গা না পেয়ে বিদেশি কোনো অতিথি এলেই সেখানে গিয়ে নালিশ করে আসেন, দেশে গণতন্ত্র নাই। গণতন্ত্র বানান করতে বললে সেটাও পারবেন কি না সন্দেহ আছে!’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকেই মাঝেমধ্যে বলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র নাই। কথাটা শুনতে হয় কাদের কাছ থেকে, সেটি হচ্ছে সব থেকে হাস্যকর ব্যাপার। যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী, ক্ষমতা আহরণকারী, ক্ষমতা দখলকারীর হাতে তৈরি দল; তাদের কাছে আজ গণতন্ত্রের কথা শুনতে হয়। তারা কোন গণতান্ত্রিক পথে তৈরি? আর কোন গণতান্ত্রিক পথে তারা ক্ষমতায় গেছে? বারবার তো ধ্বংসই করেছে এবং সেটাই তারা করতে চায়। এই দেশের মানুষকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। ’

বিএনপির অতীত ইতিহাস তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জানি না বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাস ভুলে গেছে কি না! যারা ভোট চুরি করে ক্ষমতায় বসল, গণরোষে থাকতে পারে নাই, পদত্যাগে বাধ্য হয়েছে। অথচ ২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা এলো না, না এসে শিশু থেকে শুরু করে শত শত মানুষ পোড়াল, জাতীয় সম্পদ নষ্ট করল, এটাই নাকি তাদের আন্দোলন। ’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমরা আন্দোলন করেছি জনগণকে সম্পৃক্ত করে, যার ফল আমরা পেয়েছি। আর তাদের আন্দোলনটা খুন করা, নির্যাতন করা, পোড়ানো, জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা। এই আন্দোলনে তারা জনসম্পৃক্ততা পায়নি, পেয়েছে জনগণের রুদ্ররোষ। ’ তিনি বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় বসিয়ে মন্ত্রী বানিয়ে লাখো শহীদের রক্তের সঙ্গে যারা বেইমানি করেছে, তাদের বিচারও বাংলার মাটিতে হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যুদ্ধাপরাধীদের মদদদাতা, এ দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলেছে, যারা মানুষের ধনসম্পদ লুট করেছে, অবশ্যই তাদের বিচার বাংলার মাটিতে হবে। কাজেই যত কান্নাকাটি বিদেশে করুক, ওতে লাভ নেই। আমরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি করে যাচ্ছি, করে যাব। বাংলার মানুষ বিশ্বাস করে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জনগণ কিছু পায়। ’

দলীয় যেসব সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ আসবে তাঁদের আর দল কোনো সুযোগ দেবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

বৈঠক সূত্রগুলো জানায়, সভায় জাতীয় কমিটির একাধিক সদস্য তাঁদের বক্তব্যে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দলীয় কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্যের অভিযোগ তোলেন। পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আমার কাছে সব তথ্যই আছে। আমরা এত উন্নয়ন করলাম, সেসব তথ্যের প্রচার নেই। ...আপনারা নিজেদের সমালোচনা না করে সরকারের উন্নয়নগুলো জনগণের মধ্যে তুলে ধরুন। ’ সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই আমাদের প্রাণ। সংগঠন ছাড়া কেউ এমপি-মন্ত্রী হতে পারবেন না। নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করুন, সম্পর্ক ভালো রাখুন। অভিযোগের সত্যতা মিললে আগামী দিনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এমনকি দলেও কোনো পদ দেওয়া হবে না। ’ দলীয় সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকে দিনাজপুর, পঞ্চগড়, বাগেরহাট, সিলেট, খুলনা ও সিরাজগঞ্জের জাতীয় কমিটির প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

বৈঠকে আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতাদের নিয়মিত দলীয় চাঁদা পরিশোধ করার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। আগে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য চাঁদা ১০ টাকা ছিল। গতকালের বৈঠকে তা বাড়িয়ে ২০ টাকা করা হয়েছে। কাউন্সিলরদের বার্ষিক চাঁদা ১০০ টাকার স্থলে ২০০ টাকা, দলীয় সংসদ সদস্যদের বার্ষিক চাঁদা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সবার জন্য মাসিক এক হাজার টাকা চাঁদা নির্ধারণ করা হয়।   বৈঠকে আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলনে দুই কোটি ৬৫ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলীয় কার্যালয় নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য পাঁচ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, জাতীয় কমিটির সভার সূচনা বক্তব্যে শেখ হাসিনা আগামী কাউন্সিলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের যে আহ্বান রাখেন দলীয় নেতারা এর বিরোধিতা করেন। তাঁরা সবাই শেখ হাসিনাকে পুনর্বার আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করার দাবি জানান।


মন্তব্য