kalerkantho

মঙ্গলবার। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৯ ফাল্গুন ১৪২৩। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আজ আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস

স্বামীর আয়ে সংসার চলে ঋণ পরিশোধ করে নারী

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



রংপুর অঞ্চলে নারী শ্রমিকের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। গ্রামের নিম্ন আয়ের পরিবারের নারীরা যোগ দিচ্ছে শ্রমিকদের দলে। কথা বলে জানা গেছে, এসব নারীর স্বামীর আয়ে সংসার চলে। আর নিজের আয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে তারা।

তিস্তা প্রতিরক্ষা বাঁধসহ রংপুরের চরাঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের বাস। একসময়ের অবস্থাসম্পন্ন এসব পরিবার নদীভাঙনে এখন নিঃস্ব। কোনো মতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে তিস্তা তীরবর্তী এলাকাগুলোতে। শ্রম বিক্রিই তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। বছরের বিভিন্ন সময় যখন এলাকায় কাজ থাকে না, তখন পরিবারপ্রধানরা চলে যায় ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে বেসরকারি সংস্থাগুলোর ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো। সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে মাটি কাটার মতো কাজে নেমে পড়ছে ওই সব পরিবারের নারীরা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, তিস্তার চরাঞ্চলসহ সর্বত্র এখন চলছে রাস্তায় মাটি কাটা, ধান কাটা ও আগাম রবি ফসল আবাদের কাজ। আর এসব কাজে নিয়োজিত রয়েছে নারী শ্রমিকরা।

তিস্তাপারের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মিটারী ইউনিয়নের ইচলীচরে একসঙ্গে আগাম আলু চাষের জন্য জমি তৈরির কাজ করছিল প্রায় ৩০ জন নারী শ্রমিক। তাদের মধ্যে শেফালী বেগম, জরিনা বেগম, জশোমাই, ফেলানী বেওয়া জানান, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করে তাঁরা মজুরি পান ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। সমপরিমাণ কাজের জন্য পুরুষ শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হয় ২০০ টাকা।

শংকরদহ চরের আকলিমা, ছুরতন নেছা, সবজান বেগম জানান, সংসারজীবনে এই প্রথম তাঁরা বাড়ির বাইরে মাঠের কাজে যোগ দিয়েছেন। কারণ জানতে চাইলে আঁচলে মুখ লুকিয়ে তাঁরা বলেন, প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তির টাকা দিতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চরাঞ্চলে এমন অভাবী পরিবার নেই, যারা বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) ক্ষুদ্রঋণ নেয়নি। কেউ কেউ একাধিক সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ২৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয় তাদের।

জয়রামওঝা চরের বিউটি বেগম জানান, মেয়ের বিয়ে দিতে ছয় মাস আগে ব্র্যাকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ওমার কামাইয়ে (স্বামীর আয়ে) কোনো মতে খাওয়া চলে। আর নিজের কামাইয়ে ঋণের কিস্তি দিই। ’

জোবেদা খাতুন বলেন, ‘মানুষটা তো (স্বামী) বিদেশোত (ভিন্ন জেলায়) কাম করে। মোকে কাম করি ঋণের কিস্তি দেওয়া নাগে। ’ অভাবের সময় বাঁচার তাগিদে বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা তিনি ঋণ নিয়েছিলেন।

লক্ষ্মিটারী ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য দুলাল মিয়া জানান, বর্তমানে এলাকায় একজন শ্রমিকের মজুরি চলছে ২০০ টাকা। আর নারী শ্রমিক হলে তার মজুরি দেওয়া হয় সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা।

লক্ষ্মিটারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল হাদি জানান, চরাঞ্চলের পরিবারগুলো বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার ঋণের জালে আটকে পড়েছে। সারা বছরই তাদের সপ্তাহ হিসাবে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়।

ইউপি চেয়ারম্যান আরো জানান, ঋণের কিস্তি পরিশোধের তাগিদ থেকেই দিন দিন নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। আর মহাজনরা এ সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলে এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১৫ অক্টোবর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য, ‘নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১৮-র নিচে বিয়ে নয়, আইন করে বাল্যবিয়ের স্বীকৃতি বন্ধ হোক’।

আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস উদ্‌যাপন জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের নারীদের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং সম্প্রতি বাল্যবিবাহ নিরোধকল্পে প্রস্তাবিত আইন নিয়ে নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বিগ্ন। তারা মনে করে, নারীর বিয়ের বয়স কমানো হলে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি পুরুষের বিয়ের বয়স কমানো হলে তা দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার জন্যও ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।


মন্তব্য