kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সুদিনের স্বপ্ন তাদের চোখে

‘মুখ চিনে’ সাহায্য দেওয়ার অভিযোগ

তৌফিক মারুফ, চর কুকরিমুকরি (ভোলা) থেকে   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বঙ্গোপসাগরের তীরে কৃত্রিম বনভূমিঘেরা চর কুকরিমুকরির মনুরা বাজারের চারদিকে জালের ছড়াছড়ি। তবে জলে নয়, সব জালই ডাঙ্গায়।

কেউ জাল শুকাচ্ছে, কেউ সুই-সুতা নিয়ে জাল মেরামত করছে। মনুরা বাজারের দোকানে দোকানে জেলেদের জটলা। পাশে মাছ ধরার নৌকা-ট্রলারেও শুয়ে-বসে কেউ কেউ। জেলে মাকসুদুল হক বলেন, ‘১২ তারিখ থেইকা সরকার আমাগোরে অবরোধ দিছে। আমরা ২২ দিন গাঙে ইলিশ মাছ ধরতে পারমু না। এই ফাঁকে ছিঁড়া জাল মেরামত করমু। আর নোকায় জোড়াতালি দিমু, আলকাতরা মারমু। ’

মাকসুদুলের মতো চর কুকরিমুকরির প্রায় দেড় হাজার জেলের একই অবস্থা। ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা মেনে তারা সাগরে-নদীতে যায় না। তবে এর মধ্যেও যারা নদীতে নামার চেষ্টা করছে, কোস্ট গার্ড, র‍্যাব, পুলিশ ও মত্স্য কর্মকর্তাদের সমন্বিত টিম তাদের ওপর কড়া নজর রাখছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে এই চরের পাশের নদী থেকে নৌকাসহ চার জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে ফাঁড়ির পুলিশ। পরে ভোলার চরফ্যাশন থানায় সোপর্দ করা হয় তাদের।

কুকরিমুকরির মত্স্য ব্যবসায়ী আজিজুল ভুঁইয়া বলেন, ‘দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ইলিশ মাছের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি এই চর কুকরিমুকরি। ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আমরাও মানতে চাই। এ সময় জেলেদের আমরাও নদীতে পাঠাতে চাই না। কিন্তু তাদের অনেকে আমাদের কাছে নালিশ করে যে তারা সরকারি সাহায্য পায় না। ’

নিষেধাজ্ঞা চলার সময় সাহায্য দেওয়ার জন্য তালিকা করা হয়েছে জেলেদের। তবে অনেকের অভিযোগ, সব জেলে এ সাহায্য পায় না। সরকারি সাহায্য দেওয়া হয় ‘মুখ চিনে’। জেলে নয় এমন অনেকের নামও রয়েছে তালিকায়, আবার জেলে হিসেবে এলাকার সবাই চেনে এমন হতদরিদ্র অনেকেরই ঠাঁই হয়নি ওই তালিকায়। বঞ্চিতদের কেউ নাম প্রকাশ করতে চায়নি। বলতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি একজন। তিনি বলেন, জেলে হিসেবে তাঁকে চেনে না এলাকায় এমন কেউ নেই। অথচ তাঁর নাম তালিকায় নেই। তবে পেশায় জেলে না হলেও অবস্থাপন্ন কারো কারো নাম তালিকায় উঠিয়েছেন স্থানীয় নেতারা।

১০ কেজি চাল হাতে পেয়েছেন বলে জানালেন আরেকজন জেলে। নিষেধাজ্ঞার পুরো সময় আর কত কেজি পাবেন, পেলেও কেবল কয়েক কেজি চাল দিয়ে পুরো পরিবার নিয়ে কিভাবে এ সময় পার করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ স্বীকার করেননি চর চুকরিমুকরি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল হাসেম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অবরোধের আগেই সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসনের চাল বিতরণ করা হয়েছে। কোথাও থেকে অনিয়মের কথা শুনিনি। ’

গত ১০-১২ বছরের মধ্যে এবার ইলিশের সবচেয়ে ভালো মৌসুম ছিল বলে জানালেন এ চরের মত্স্যজীবী ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের হিসাবে, নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত চলতি মৌসুমে এ চরে অন্তত ১৫০০ কোটি টাকার ইলিশ বিক্রি হয়েছে। এতে ভাগ্য ফিরেছে এমন অনেক জেলের, যারা গত কয়েক বছরে দেনার জালে জড়িয়ে গিয়েছিল। তাদের একজন সোলায়মান। তাঁরা তিন ভাই ও বাবা মিলে চলতি মৌসুমে ১৬ লাখ টাকার ইলিশ ধরে বিক্রি করেছেন। ট্রলার ছাড়া তাঁদের বিনিয়োগ ছিল আড়াই লাখ টাকা। এবারের লাভ দিয়ে আগের দেনা শোধ করে কিছু টাকা হাতে রয়েছে। ওই টাকা দিয়ে নতুন নৌকা তৈরি করবেন সোলায়মান। তত দিনে নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়ে যাবে। ২ নভেম্বরের পর নতুন নৌকা নিয়ে নতুন উদ্যমে বাপ-ভাইদের নিয়ে ইলিশ ধরতে নামবেন—সেই আশায় দিন কাটছে সোলায়মানের।

ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর সোলায়মানের মতোই সুদিনের স্বপ্নে বিভোর চর কুকরিমুকরির মত্স্যজীবীরা।


মন্তব্য