kalerkantho


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জালিয়াতকে পুলিশে দিলেও ছাড়িয়ে নেন ছাত্রলীগ নেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জালিয়াতকে পুলিশে দিলেও ছাড়িয়ে নেন ছাত্রলীগ নেতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা এক শিক্ষার্থীকে আটক করে থানায় দেওয়ার পর ছাড়িয়ে এনেছেন ছাত্রলীগের এক নেতা। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মেহেদী হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের সঙ্গে আলোচনা করে জালিয়াতচক্রের সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন অভিকে ছাড়িয়ে আনেন।

অভির বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ ওঠে, চট্টগ্রামে কর্মরত এক ব্যক্তির ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার শর্তে তিনি দুই লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। থানা থেকে ছাড়িয়ে এনে ওই টাকা আদায় করার লক্ষ্যে অভিকে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মারধর করা হয়। বিষয়টি ছাত্রলীগের হল শাখার নেতাকর্মীদের মধ্যে জানাজানি হলে অভিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

অভিকে হলে আটকে রাখার অভিযোগ তদন্ত করতে হল প্রশাসন একটি কমিটি গঠন করেছে বলে জানিয়েছেন হলের প্রাধ্যক্ষ নিজামুল হক ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘ওই ছাত্র আমাদের হলের না, কিন্তু আটকে রাখা হয়েছিল এখানে। সেই ঘটনাটি তদন্তে হলের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম আমজাদ আলী গত সোমবার সন্ধ্যায় অভিকে থানায় দেন। সেদিন রাতেই প্রক্টরের সঙ্গে আলোচনা করে থানা থেকে অভিকে ছাড়িয়ে আনেন ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী হাসান ও অভির বন্ধু আমিনুল ইসলাম।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, ভর্তি করানোর নামে নেওয়া টাকা আদায় করতে অভিকে হলে আটকে রাখেন মেহেদী ও আমিনুল। টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁরা একটি মোটরসাইকেল ও দুটি আইফোন কেড়ে নেন।

জানা যায়, চট্টগ্রামে চাকরিরত এক ব্যক্তির ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার শর্তে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন অভি। কিন্তু ভর্তি করাতে ব্যর্থ হওয়ার পর সেই টাকা ফেরত দেননি অভি। মোবাইল ফোন নম্বর পরিবর্তন করে এত দিন তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে টাকা আদায়ের জন্য অভির বন্ধু মার্কেটিং বিভাগের আমিনুলের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। অভি স্যার এ এফ রহমান হলের ছাত্র হলেও আমিনুলের সঙ্গে মুহসীন হলে থাকতেন। চট্টগ্রামে কর্মরত ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা হওয়ার পর আমিনুল টাকা আদায় করে দিতে  মেহেদী হাসানের দ্বারস্থ হন। অভিকে আটক করার পর প্রক্টরের সহায়তায় শাহবাগ থানায় দেওয়া হয়। তবে মেহেদী নিজেই এই বিচার করার আশ্বাস দিয়ে থানা থেকে অভিকে ছাড়িয়ে আনেন। আমিনুলের পাহারায় মুহসীন হলে মেহেদীর ৩৫৭ নম্বর কক্ষে আটক রেখে অভিকে মারধরও করা হয়েছে। অভির গলায় ও নাকে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

অভি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মামার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলাম। দিতে পারিনি। সেই টাকা আদায়ে মামা আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মেহেদী ও আমিন আমাকে আটকে সেই টাকা ফেরত দিতে বলে। পরে প্রক্টরের মাধ্যমে থানায় দেয়। সেখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হলের ৩৫৭ নম্বর কক্ষে আটকে রাখে। মারধরও করেছে। মোটরসাইকেল ও দুটি ফোনও কেড়ে নিয়েছে। ’

এএফ রহমান হলের এক শিক্ষার্থী ও অভির বন্ধু নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অভি ওই ব্যক্তিকে মামা দাবি করলেও আসলে তিনি তার মামা নন। নিজে এই অভিযোগ থেকে বাঁচতে মিথ্যা কথা বলছে। অভি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে বেশ দক্ষ। দীর্ঘদিন থেকে ভর্তি ও চাকরির পরীক্ষায় জালিয়াতিতে জড়িত। এই অভিযোগে তাকে হল থেকে বের করা হলে মুহসীন হলে থাকত। ’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম আমজাদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভি দীর্ঘদিন থেকেই প্রশ্নপত্র জালিয়াতিতে জড়িত। সে নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছে। দীর্ঘদিন থেকেই তাকে আমরা খুঁজছি। এ বছর ও আগের বছর জালিয়াতি করতে পারেনি, কারণ প্রশ্নপত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের বছর জালিয়াতিতে জড়িত ছিল। ’

এক প্রশ্নে জবাবে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর বলেন, ‘হাতিয়ে নেওয়া টাকা উদ্ধার করে দেবে এমন আশ্বাসে মেহেদী অভিকে নিয়ে যায়। ভুক্তভোগী পরিবারটি যেন টাকা ফেরত পায় এ জন্যই মধ্যস্থতা করতে দেওয়া হয়েছে। মারধর করা ও আটকে রাখার বিষয়টি হওয়ার কথা ছিল না। ’

শাহবাগ থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘জালিয়াতির অভিযোগে এক ছাত্রকে থানায় দেয় প্রশাসন। তবে তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে ছাত্রলীগের এক নেতা তদবির করলে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এমনটি হয়। প্রশাসন কাউকে পুলিশের হাতে দিলে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ’

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সহসভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। রাজনীতি থেকে দূরে সরাতে এমনটি করা হচ্ছে। মূলত বিষয়টি মীমাংসা করতেই প্রক্টরের সঙ্গে আলোচনা করে থানা থেকে আনা হয়েছে। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে বিষয়টি অন্যভাবে প্রবাহিত করা হচ্ছে।


মন্তব্য