kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলাদেশ-চীন সামরিক সম্পর্ক নতুন বাঁকে

কাজী হাফিজ   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশ-চীন সামরিক সম্পর্ক নতুন বাঁকে

বাংলাদেশ নৌবাহিনী মাস দুয়েকের মধ্যেই প্রথমবারের মতো পেতে যাচ্ছে চীনের তৈরি দুটি মিং ক্লাস সাবমেরিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে এ দুটি সাবমেরিন সংযোজন করা হবে ২০১৬ সালের মধ্যে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য চীনের উচাং শিপইয়ার্ডে নির্মিত হচ্ছে দুটি আধুনিক করভেট ক্লাস যুদ্ধজাহাজ। নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ গত ৯ আগস্ট ওই যুদ্ধজাহাজ দুটির নির্মাণকাজ (স্টিল কাটিং) উদ্বোধন করেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর ঘিরে এখন দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সামরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

দেশের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ও চীনের সামরিক সহযোগিতা ও সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই চলমান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ সহযোগিতা ও সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধকৌশলগত এবং ভূরাজনৈতিক বিষয়ও যুক্ত। চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি এ সামরিক সহযোগিতা দরকার বাংলাদেশেরও। আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থ বিবেচনায় রেখে এ সহযোগিতার পক্ষেই প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।

বহির্বিশ্বেও বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে টোকিওভিত্তিক অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ গত বছর ৪ ডিসেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকের চীন সফর এবং সেখানে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও গণমুক্তি ফৌজের ডেপুটি চিফ অব জেনারেল স্টাফের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিবিষয়ক ওই সাময়িকী। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবিষ্যতে উভয় দেশ একটি গভীর সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশের সামরিক যন্ত্রাংশের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা চীন। চীন ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশকে যেসব সমরযান ও সমরাস্ত্র দিয়েছে তা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, হার্ডওয়্যার বিনিময় ছাড়াও সহযোগিতা বিস্তৃত করার পথেই এগিয়ে চলেছে দুই দেশ। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহায়তা বিনিময়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন উঁচু মাত্রায়। বাংলাদেশে ভারত প্রতি বছর যত প্রতিনিধি পাঠায়, চীনের গণমুক্তি ফৌজও প্রায় সমসংখ্যক প্রতিনিধি পাঠায়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের সফরকালে চীনের গণমুক্তি ফৌজের উপপ্রধান আশা প্রকাশ করে বলেন, কর্মকর্তাদের সফর বিনিময়, সামরিক একাডেমিগুলোর যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে উভয় দেশের সামরিক বাহিনী। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করতে আগ্রহী বাংলাদেশও। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রীকান্ত কোনদাপাল্লির রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যানুসারে ২০১৪ সালে চীনের উচ্চপদস্থ এক সামরিক কর্মকর্তার ঢাকা সফরকালে দুই পক্ষের মধ্যে সই হওয়া এক চুক্তিতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের চীনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা উল্লেখ আছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, পঁচাত্তরের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের গণমুক্তি ফৌজের যে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক তৈরি হয় তা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এক সময় চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশে সমরাস্ত্র কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়। এই কারখানা থেকে এখন সমরাস্ত্র তৈরি হচ্ছে। চীন থেকে যেসব সামরিক সরঞ্জাম আনা হয় তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও বাংলাদেশে আছে এবং এগুলো কার্যকর। এ ছাড়া ইউরোপ-আমেরিকা থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল। চীনের ক্ষেত্রে তা নয়। এ ক্ষেত্রে সহজে ঋণসুবিধাও পাওয়া যায়। এম সাখাওয়াত হোসেন আরো বলেন, সামরিক সম্পর্ক ও চুক্তির বিষয়টি রাষ্ট্রের স্বার্থেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। তবে সম্পর্কের উন্নয়ন বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা থেকে কিছুটা ধারণা করা যায়।  

অন্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রশীদ বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক অনেকভাবে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে এ সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে গভীর হয় এবং সামরিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। বর্তমানে এ সম্পর্কে চীনের কৌশলগত একটি দিক রয়েছে, সেটি হচ্ছে এশিয়ায় বিশেষ করে ভারত মহাসগরে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্য অর্জন। এ লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায় চীন। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত মহাসাগর নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে নতুন মেরুকরণ হচ্ছে। এ মেরুকরণ বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে। তবে সামরিক সম্পর্কের চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হওয়া বাংলাদেশের জন্য বেশি প্রয়োজন। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকতে হবে উন্নয়নের গতিধারার মধ্যে। বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্টগুলোতে চীনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গেও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সামরিক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে সেভাবেই এগোতে হবে।

চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল চ্যাং ওয়ানকুয়ানের নেতৃত্বে ৩৯ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসে গত ২৮ মে। ওই সময় জেনারেল চ্যাং ওয়ানকুয়ান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১৪ সালে চীন সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই সফরেই দুই দেশের মধ্যে ‘স্টেট টু স্টেট’ এবং ‘মিলিটারি টু মিলিটারি’ সম্পর্ক উন্নয়নে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে খুবই ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও মতবিনিময় হয়েছে। তিনি সেনাবাহিনীর মধ্যম সারির এবং জুনিয়র অফিসারদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

গত বছর ডিসেম্বরে সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক চীন সফর করেন। বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার গত ২ সেপ্টেম্বর  চীন সফরে গিয়ে চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও বিমানবাহিনীর কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করেন। এ ধরনের সফর বিনিময় গত সাত বছরে বেড়েছে।

এদিকে পশ্চিম ইউরোপের দিকে চীনের কল্পিত আন্তদেশীয় বাণিজ্যিক পথ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’-এ গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলাদেশ। এ পরিকল্পনায় বাংলাদেশ সংযোগকারী দেশ ছাড়াও ম্যারিটাইম সিল্ক রোডেরও অন্তর্ভুক্ত। তবে ম্যারিটাইম সিল্ক রোডে ‘সামরিক সুর’ আছে। পর্যবেক্ষকরা অনেক সময়ই সামুদ্রিক অবকাঠামোয় চীনের বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন নেওয়ার পর বাংলাদেশে সাবমেরিন ঘাঁটি বানাতে হবে এবং বিষয়টি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। দুই পরাক্রমশালী দেশের নিজস্ব লড়াইয়ের মাঝখানে পড়তে চায় না বাংলাদেশ। গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালে উভয় পক্ষ একটি চুক্তি সই করে। ওই চুক্তি মোতাবেক ভারতের কার্গো জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতকে বাংলাদেশ আশ্বস্ত করে যে, বন্দরটি চীনের ‘পার্ল অব স্ট্রিং’-এর পার্ল বা মুক্তো হিসেবে কাজ করবে না।


মন্তব্য