kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভবদহের জলাবদ্ধতা

চার লাখ মানুষের কষ্ট শিগগিরই দূর হচ্ছে না

সংশয়ে বোরো আবাদ

ফখরে আলম, যশোর   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ভবদহ এলাকায় দুই শতাধিক গ্রামে চার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। গত আগস্টে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে।

সেই থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়ে আছে মানুষ। একটি এক্সকাভেটর দিয়ে নদীর পলি অপসারণের ফল এখনো পায়নি মানুষ। শোলগাতি এলাকায় চ্যানেল কাটার কাজও ‘চেষ্টার’ মধ্যেই আটকে আছে। স্থায়ী সমাধানের টিআরএম প্রকল্পে শুধু সমীক্ষার কাজেই লাগবে চার মাস। ফলে শিগগিরই দুর্ভোগের অবসান হচ্ছে না। সামনে বোরো মৌসুমের আবাদ নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে ২০১২ সালে জোয়ারাধার (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট-টিআরএম) প্রকল্প চালু না করার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে দুর্গত মানুষ দ্রুত পানি নিষ্কাশনের দাবিতে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেওয়াসহ বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছে। কিন্তু কাজ হয়নি। পানি নিষ্কাশনে সরকারি উদ্যোগে দৃশ্যত কোথাও কোনো কাজ শুরু হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, ‘স্লুইস গেট থেকে শোলগাতি পর্যন্ত শ্রী ও হরি নদীর ৯ কিলোমিটার চ্যানেল কেটে দিলে পানি নামবে। আমরা সেই চেষ্টা করছি। তবে ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য টিআরএম প্রকল্প চালুর কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য সমীক্ষার কাজ চলছে, যা শেষ হতে অন্তত চার মাস লাগবে। এরপর প্রকল্প পরিকল্পনা ঢাকায় পাঠানো হবে। প্রকল্প পাস হলে কাজ শুরু হবে। সেই হিসাবে সরকারি উদ্যোগে পানি সরানোর কাজ শুরু হতে এখনো ছয় মাস বাকি। ’

যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য স্বপন কুমার ভট্টাচার্য বলেন, ‘সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে আমি নিজ উদ্যোগে একটি এক্সকাভেটর মেশিন এনে পলি অপসারণ করাচ্ছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলেছে, তাদের প্রকল্প নেই। পরে টাকা দেবে। বর্তমানে পানি কিছুটা কমলেও আগামী বোরো ধান চাষ করা যাবে কি না তা বলা যাচ্ছে না। ’

মণিরামপুর উপজেলার জলাবদ্ধ কুমারসীমার গ্রামের সুকৃতি রায় বলেন, ‘আমরা পানিবন্দি হয়ে আছি তিন-চার মাস। সরকার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। আমরা জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী সমাধান চাই। ’ উপজেলার পাঁচকাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক নিত্যরঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা রাজনীতির শিকার। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আমাদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছে। তাঁদের দ্বন্দ্বের কারণে ২০১২ সালে টিআরএম চালু করা যায়নি। তখন টিআরএম চালু হলে এখন আমাদের এই দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হতো না। আমরা এর থেকে নিস্তার চাই। ’

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রনজিৎ বাওয়ালী বলেন, ‘ভবদহ এলাকার লাখ লাখ মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। আমরা দ্রুত পানি সরানোর জন্য তিনটি এক্সকাভেটর দাবি করেছিলাম, কিন্তু একটির বেশি আসেনি। অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে থাকা মানুষ রাজপথে নেমেছে। কিন্তু পানি না সরিয়ে পুলিশ তাদের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। এভাবে বাঁচা যায় না। আগামী ইরি মৌসুমে ধান চাষ না করতে পারলে এই এলাকার মানুষকে না খেয়ে মরতে হবে। ’

উল্লেখ্য, যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর, ঝিকরগাছা, খুলনার ফুলতলা উপজেলা এলাকার ৫২টি বিল এলাকা ভবদহ নামে পরিচিত। ভবদহে পানি বের হওয়ার বিরাট একটি স্লুইস গেট আছে। আশির দশকে এই ভবদহে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলে ১০ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর জলাবদ্ধতা নিরসনে পানি উন্নয়ন বোর্ড শত শত কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই চলতি বছরের আগস্ট মাসে অতিবর্ষণে ফের ভবদহ এলাকায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়। এই উপজেলাগুলোর পাশ দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ, হরি, শ্রী, টেকা, ভৈরব ও মুক্তেশ্বরী নদী পলি পড়ে ভরাট হওয়ার কারণে পানি উপচে গ্রামের পর গ্রাম ভাসিয়ে দেয়। অন্যদিকে ভবদহ স্লইস গেটের দুই পাশেও পালি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি গ্রামে ও বিলে আটকে থাকে। ফলে এক মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে।


মন্তব্য