kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খুলনায় শিল্পপতিকে রিমান্ড চায় পুলিশ

ঠিকাদার থেকে ব্যবসার নানা চোরাগলিতে

গৌরাঙ্গ নন্দী ও কৌশিক দে, খুলনা   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



খুলনার আলোচিত শিল্পপতি কাজী শাহনেওয়াজ ব্যবসার নানা চোরাগলিতে বিচরণ করে শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে গিয়ে ধরা পড়লেন। নকল ওষুধ তৈরির অভিযোগে র‌্যাব তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।

এই ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিন হেফাজতে চেয়েছে পুলিশ।

একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক শাহনেওয়াজ রপ্তানি বাণিজ্যে অবদান রেখে একাধিকবার সিআইপি হয়েছেন, ব্যবসায়ীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্তু ব্যবসায় সুস্থ-স্বাভাবিক পথ ছেড়ে বরাবরই তিনি চোরাগলিতে হেঁটেছেন।

পুলিশ ও ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, ভুয়া তথ্য দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল কাজী শাহনেওয়াজের। এ জন্যে প্রতিপক্ষের মনে ভীতি সঞ্চারে তিনি একটি পিস্তল ব্যবহার করে থাকেন। এ নিয়ে নানা কথাও বাজারে চালু আছে। তবে কেউ জানতো না যে তিনি মানুষের জীবন নিয়েও ব্যবসা করেন।

গত সোমবার তাঁর হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাব নকল ওষুধ ও ভেজাল প্রসাধন সামগ্রীর বিশাল মজুদ জব্দ করেছে।

র‌্যাব-৬-এর খুলনার অধিনায়ক পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) খন্দকার রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, ঢাকার মিটফোর্ডের ওষুধের বাজার থেকে ভেজাল ওষুধ জব্দ করার সূত্র ধরে তাঁরা খুলনার রূপসার চরে একটি আস্তানা খুঁজে পেয়েছেন। যে আস্তানাটি কাজী শাহনেওয়াজের মালিকানাধীন শাহনেওয়াজ সি ফুডের কার্যালয়। তাঁরা নিশ্চিত হয়েই অভিযান পরিচালনা করেন।

ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা কাগজপত্রে দেখা গেছে, ওষুধ কম্পানির নাম ‘প্রিন্স ফার্মাসিউটিকাল অ্যান্ড হারবাল ইন্ডাস্ট্রিজ’, খুবই ছোট করে লেখা আছে ‘এ সিস্টার কনসার্ন অব শাহনেওয়াজ গ্রুপ’, চর রূপসা, খুলনা। আর একটি বিলের কাগজে লেখা রয়েছে ‘প্রিন্স ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড কোম্পানী’ (শাহনেওয়াজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান)। প্রিন্স টাওয়ার, দ্বিতীয় তলা, বাড়ি নং-৫৮৪ রোড নং-৬, বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড, আদাবর, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

প্রসঙ্গত, কাজী শাহনেওয়াজের একমাত্র ছেলের নাম প্রিন্স। খুলনা নগরের রূপসা স্ট্রান্ড রোডের বাড়িটিরও নাম ‘প্রিন্স হাউস’। প্রিন্স ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড কম্পানির বিলে উল্লেখ করা রয়েছে, ডিটারজেন্ট পাউডার, শ্যাম্পু, সরিষার তেল, টয়লেট ক্লিনার, ক্রিম, লজেন্স, ওরস্যালাইন, চিরতা ক্যাপসুল, কালোজিরা তেল, স্পিরুলিনা ট্যাবলেট ইত্যাদি উত্পাদন ও বিক্রয় করা হয়। তবে এসব যেখান থেকে উদ্ধার হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের সামনে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কোনো সাইনবোর্ড নেই। সাইনবোর্ড রয়েছে, ‘শাহনেওয়াজ গ্রুপ’ ও ‘শাহনেওয়াজ সি ফুড লি.’-এর।

ভেজাল ওষুধ উদ্ধার হওয়ার পর কম্পানির পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে, এই ভবনটির একতলা ও দোতলা ভাড়া দেওয়া হয়েছিল জনৈক হাবিবকে। তবে এর পক্ষে কোনো প্রমাণপত্র কাজী শাহনেওয়াজ কাউকে দেখাতে পারেননি। এমনকি র‌্যাবের অভিযানকালে সেখানে গিয়ে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অভিযানকারীদের তিনি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-দাতা বলেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। অভিযানকারীরা সেখান থেকে উদ্ধার করা চাল গুঁড়ো করার যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিকের প্যাকেট, ক্যাপসুলের প্যাকেট, ওষুধ তৈরির নানা রাসায়নিক উপাদান, নামিদামি কম্পানির লেবেল সংবলিত ওষুধ, ড্রামভর্তি তরল শ্যাম্পু প্রভৃতি উদ্ধার দেখিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে খুলনার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে কাজী শাহনেওয়াজকে হাজির করা হয়। তাঁকে পাঁচ দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসবাদের (রিমান্ড) জন্য আবেদন করেছে পুলিশ। বিচারক মো. নাসির উদ্দিন ফারাজী আবেদন আমলে নিয়ে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এর আগে সোমবার রাতে র‌্যাবের সহকারী পরিচালক নাজমুল হুদা বাদী হয়ে রূপসা থানায় শিল্পপতি শাহনেওয়াজসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করেন।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন ব্যবসায়ী জাকির হোসেন, হাবিবুর রহমান ও মো. সজীব। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরো ১২-১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

শাহনেওয়াজের কারখানায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাব সেখান থেকে এসিআই কম্পানির লেবেল লাগানো তিন লাখ ৭৫ হাজার ফ্লু-ক্লক্স-৫০০ মিলিগ্রামের ক্যাপসুল, অপসোনিনের লেবেল লাগানো এক বস্তা রেনিটিড-১৫০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট, এসকেএফের লেবেল লাগানো ফ্লু-ক্লক্সিন-৫০০ মিলিগ্রামের ক্যাপসুল, চার হাজার বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট, আড়াই লাখ ক্যাপসুলের খালি খোসা, ওষুধের ২১টি বড় মোড়ক (ফয়েল) জব্দ করে।

কাজী শাহনেওয়াজের উত্থান : এই ব্যবসায়ী একসময় বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি খুলনা চেম্বার অব কমার্সের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

নড়াইলের বাসিন্দা কাজী শাহনেওয়াজ খুলনার আযম খান কমার্স কলেজে পড়াশোনা করতেন। ছিলেন ছাত্রলীগের নেতা। কর্মজীবনে গণপূর্ত বিভাগের কেরানি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারদের বিল আত্মসাৎ করার দায়ে তিনি সাময়িক বরখাস্ত হন। ঘটনাটি ১৯৭৩-৭৪ সালের। এরপর শাহনেওয়াজ ভাড়াটে হিসেবে ঠিকাদারদের হয়ে কাজ করতেন। একসময় তিনি নিজেই ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। এ সময় শাহনেওয়াজ কাজ না করেও অনেক কাজের বিল আদায় করেছেন ভয় দেখিয়ে, এ ক্ষেত্রে তাঁর একটি পিস্তল ব্যবহার করার বিষয়টি আলোচিত।

এরপর চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ কারখানা খোলেন এই ব্যবসায়ী। জনতা ব্যাংক খুলনা করপোরেট শাখার ঋণ নিয়ে রূপসার চরে গড়ে তোলেন ‘শাহনেওয়াজ সি ফুড লিমিটেড’। বিদেশে চিংড়ি রপ্তানি করে ওজনে কম দেওয়ার জন্য তাঁর এ প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। তাঁর কারখানায় ১১ বার এই ঘটনা ঘটে।

একই সঙ্গে কাজী শাহনেওয়াজ ঢাকায় নড়াইল গার্মেন্টস এবং খুলনায় মৌলি প্রিন্টার্স অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের ব্যবসা শুরু করেন। এই ব্যবসার নামে তিনি বন্ড ওয়্যার হাউসের (শুল্কমুক্ত গোডাউন) সুবিধা নিয়ে পণ্য আমদানি করেন। আমদানি করা সেই পণ্যের কোনো প্রকার শুল্ক না দিয়ে তিনি খোলা বাজারে বিক্রি করে দেন।

মংলা কাস্টম হাউস সূত্রে জানা যায়, শাহনেওয়াজ গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মেসার্স মৌলি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড শুধু ২০১৪-১৫ অর্থবছরে শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে এক কোটি ৫৯ লাখ ৬১ হাজার ৫৬৪ টাকা।


মন্তব্য