kalerkantho


জাল, ভুল দলিল বাতিলের ধারায় পরিবর্তন দরকার

আপেল মাহমুদ   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জাল, ভুল দলিল বাতিলের ধারায় পরিবর্তন দরকার

সঠিক-বেঠিক যাই হোক, দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে সেটি সাবরেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রার কেউই বাতিল করতে পারেন না। দলিলের দাতা-গ্রহীতার ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্যও আর থাকে না।

ওই দলিল বাতিলের জন্য আদালতে যেতে হয়, বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। এ জন্য সময় ও অর্থ—দুটিরই অপচয় হয়।

কয়েকজন সাবরেজিস্ট্রার কালের কণ্ঠকে বলেন, অনেক সময় সাবরেজিস্ট্রার বা দাতা-গ্রহীতার কারণে ভুল তথ্যসহ দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে যেতে পারে। প্রায়ই জালিয়াতচক্র জাল নথিপত্রের মাধ্যমে অন্যের জমি রেজিস্ট্রি করে নেয়। রেজিস্ট্রির পর ভুল ধরা পড়লেও সাবরেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রার দলিল বাতিল করতে পারেন না। এ জন্য দেওয়ানি আদালতে দৌড়াতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়।

কয়েকজন দলিল লেখক বলেন, সাবরেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রারকে দলিল বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হলে জাল নথিপত্র দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রির পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। অনেক সময় ভুলক্রমে এক সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল অন্য অফিসে রেজিস্ট্রি হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট ফি ও কর কমবেশি হয়ে যায়। পরে এসব ধরা পড়ে। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় তাত্ক্ষণিকভাবে সেসব সংশোধনের উপায় থাকে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবরেজিস্ট্রার বলেন, একজন এসি ল্যান্ড (সহকারী কমিশনার, ভূমি) নামজারি করার পর মিস কেসের মাধ্যমে তা বাতিল করতে পারেন। ফৌজদারি আইনে নামজারিকে বিচারিক কাজ হিসেবে অনুমোদন দেওয়ার পরও জনস্বার্থে এসি ল্যান্ডকে তা বাতিল করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আদালতের ঝামেলা থেকে জমির মালিকরা রেহাই পেয়েছে। দেওয়ানি মামলার সংখ্যা অনেক কমেছে। তিনি বলেন, যদি সাবরেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রারকে ত্রুটিপূর্ণ দলিল বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয় তাহলে দেওয়ানি মামলা আরো কমে যাবে। নিরীহ জমি মালিকদের বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়াতে হবে না। জমি জালিয়াতিও বন্ধ হবে।

নিবন্ধন পরিদপ্তর সূত্র মতে, সাবরেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রারকে এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হলে সুফল পাওয়া যাবে। এ ক্ষমতা জেলা রেজিস্ট্রারকে দেওয়া যেতে পারে বলে পরিদপ্তরের কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করেন। সাবরেজিস্ট্রারদের দলিল বাতিলের জন্য জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করাই উচিত হবে। জেলা রেজিস্ট্রার কাগজপত্রের যথার্থতা ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দলিল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেবেন। এমন ব্যবস্থা হলে দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে জালিয়াতি অনেক কমে যাবে।

আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাল বা ভুল দলিল বাতিলের ক্ষমতার বিষয়ে তাঁরা নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করছেন। বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা এ নিয়ে আইনসচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন। সচিব বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং আলাপ-আলোচনা করে উপায় বের করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে এটি গ্রহণযোগ্য মনে হলে আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।

বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব শেখ কাওসার আহমেদ বলেন, সাবরেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রার যদি জাল বা ভুল দলিল বাতিলের ক্ষমতা পান তাহলে মানুষ উপকৃত হবে। দলিল রেজিস্ট্রির কাজে অনেক স্বচ্ছতা আসবে। দলিলে ভুল ধরা পড়া মাত্র সংশোধনের ব্যবস্থা করা যাবে।

অবসরপ্রাপ্ত আইজিআর (ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন) মিজানুর রহমান বলেন, সাবরেজিস্ট্রার দলিল গ্রহণ করলেই সেটি রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে মনে করা ঠিক নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সূচিপত্র ও বালাম বইয়ে সংযুক্তি না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সেটিকে রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বলা যাবে না। এ সময়ের মধ্যে ফি বা কর আদায়ের ভুল সংশোধন করা যায়। কিন্তু দলিল সংশোধন বা বাতিল করা যায় না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হয়। মামলা চালাতে গিয়ে তাকে অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়, আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সিলেট জেলা রেজিস্ট্রার দীপক কুমার সরকার বলেন, সাবরেজিস্ট্রারের ভুল বা জাল দলিল রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করতে পারেন। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৭২ থেকে ৭৬ ধারায় এসব বিষয় উল্লেখ করা আছে। তবে দলিল বাতিলের বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। এ কারণে জেলা রেজিস্ট্রাররা দলিল বাতিল করতে সাহস করেন না।

দীপক কুমার বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের রেজিস্ট্রেশন আইনের উৎস ব্রিটিশ আইন। সময়ের প্রয়োজনে ভারতে ১৯০৮ সালের আইনের পরিবর্তন হয়েছে। দক্ষিণ ভারতে এ আইন সংস্কার করে সাবরেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারকে রেজিস্ট্রিকৃত ভুল বা জাল দলিল বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সেখানে জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা অনেক কমে গেছে। বাংলাদেশে আইন সংস্কার হলেও এ ব্যবস্থা করা হয়নি।


মন্তব্য