kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গোড়ায় গলদ ছাত্রলীগের

রফিকুল ইসলাম   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৭ বছরের কম বয়সী ছাত্রছাত্রী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রাথমিক সদস্য হতে পারেন। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম এই সংগঠনটির গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে, ‘স্ব স্ব জেলার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সংসদ নির্ধারিত সদস্য পদ পাওয়ার নিয়ম অনুসরণ করে শপথপত্রে স্বাক্ষর করে সদস্য হতে হবে।

প্রতি শিক্ষাবর্ষে এই সদস্য পদ নবায়ন করতে হবে। ’ কিন্তু ছাত্রলীগের সদস্য হওয়ার এই গঠনতান্ত্রিক বিধানের বাস্তবায়ন নেই তেমন। এতে সারা দেশে সংগঠনটির উপজেলা বা থানা, জেলা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটে কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা নেতাদের বাইরে কর্মীদের সাংগঠনিক বৈধ পরিচয় থাকছে না। যদিও তারা ছাত্রলীগের কর্মী পরিচয়ে দলীয় সভা-সমাবেশে নিয়মিত অংশ নিয়ে থাকে। আর বৈধ প্রাথমিক সদস্য পদ না থাকায় কোনো কর্মী অপরাধমূলক কাজে জড়িত হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে দায় এড়ানো সহজ হয়।

সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, ছাত্রলীগে যুক্ত হতে প্রাথমিক সদস্য হওয়ার নিয়মটি কার্যকর না থাকায় এক সময়ে ছাত্রদল কিংবা শিবিরে সম্পৃক্ত থাকা লোকজন ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করছে। অনেকে প্রাথমিক তথ্য গোপন রেখেও সংগঠনে রয়েছে। ছাত্রলীগে ঢুকে নিজেদের এজেন্ডাও বাস্তবায়ন করছে কেউ কেউ। সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে এ ধরনের অনুপ্রবেশ সম্ভব হতো না। এ ছাড়া সদস্য প্রক্রিয়া চলমান না থাকায় ছাত্রলীগের কর্মী কত সেই হিসাব কেন্দ্রের কাছে নেই।

সংগঠন সূত্রে জানা যায়, অপকর্ম ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে চার বছর আগে ২০১২ সালে সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল ছাত্রলীগ। সারা দেশে ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রাথমিক সদস্য হওয়ার ওই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। ঘটা করে ওই কর্মসূচি উদ্বোধন করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি চার বছরেও। একইভাবে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সদস্যসংখ্যার সীমারেখা, কমিটির মেয়াদসহ গঠনতন্ত্রের অনেক নিয়মই মানছে না ছাত্রলীগ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সদস্যসংখ্যা হবে সর্বোচ্চ ১২১। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগে গত ২১ মে ২০১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। গঠনতন্ত্রের ১১(ক) ধারায় বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ গঠিত হবে ২৫১ সদস্য সমন্বয়ে। অথচ চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত কমিটিতে মাদক কারবার, অপহরণ, হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা অনেকের নামও রয়েছে।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের মেয়াদ দুই বছর। এই সময়ের মধ্যে সব জেলার কমিটি গঠন ও পূর্ণাঙ্গ করার বিধান রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এরই মধ্যে কমিটি এক বছর পার করলেও সব কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও এই কমিটির তত্ত্বাবধানে থাকা হল কমিটি এখনো অপূর্ণাঙ্গ।

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিক সদস্য হওয়ার মাধ্যমে দলে যুক্ত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সদস্য ফরম পূরণ ও শপথবাক্য পাঠের মাধ্যমে সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করতে কর্মসূচি নেওয়া হলেও কেউ তা বাস্তবায়ন করেনি। একজন শিক্ষার্থী কেন ছাত্রলীগে যোগ দেবে তা তাকে জানাতে সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া ও ঘোষণাপত্র জানা দরকার। সদস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া বা সদস্য ফরম পূরণ না করে সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করলে সংগঠনের নীতি-আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষয়টি খুবই গুরুত্ব সহকারে নিয়ে চলমান রাখতে হবে। ’

ছাত্রলীগের রিপন-রোটন কমিটির একজন সহসভাপতি নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের আগে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ছাত্রদল কিংবা ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল এমন কয়েকজন ছাত্রলীগে পদ পেয়েছে। কাজেই কারা প্রকৃত ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত সেটি প্রমাণ করার সময় এসেছে। অনুপ্রবেশকারীদের পদচারণে ছাত্রলীগ কলুষিত হতে পারে না। ’

সংগঠনটির সাবেক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতার মতে, প্রাথমিক সদস্য পদের ভিত্তিতে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলে কর্মীদের পরিচয় নির্দিষ্ট করা সহজ হয়। সারা দেশে ছাত্রলীগের লাখ লাখ কর্মী রয়েছে, কিন্তু কেউ প্রাথমিক সদস্য হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় নয়। থানা, জেলা, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পরিচিতির মাধ্যমেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। কাজেই ঢালাওভাবে সবাইকে ছাত্রলীগের কর্মী বিবেচনায় না নিয়ে প্রাথমিক সদস্য পদের ভিত্তিতে রাজনীতির সুযোগ দেওয়া দরকার। এতে কারো ব্যক্তিগত দায় সংগঠনের ওপর পড়বে না। ছাত্রদল কিংবা শিবিরের কর্মীরাও দলে ঢুকতে পারবে না।

সদস্যদের চাঁদা আদায়ের কার্যক্রম নেই : গঠনতন্ত্রের ২৩(খ) ধারায় বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের প্রত্যেক সদস্য মাসিক ২০ টাকা, কেন্দ্রীয় কমিটির প্রত্যেক সদস্য মাসিক ১৫ টাকা, জেলা কমিটির প্রত্যেক সদস্য মাসিক ১০ টাকা ও নিম্নতম কমিটির সদস্য মাসিক ৫ টাকা হারে চাঁদা প্রদান করবেন। কোনো সদস্য পর পর তিন মাস চাঁদা বাকি রাখলে সেই সদস্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কমিটি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের কার্যক্রম নেই।

ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার শাহজাদা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাঁদা পরিশোধ করা গঠনতন্ত্রে থাকলেও কেউ দেয় না। আর কারো কাছ থেকে নেওয়াও হয় না। দলীয় সহায়তা ও অনুদানে ছাত্রলীগ চলছে। জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সহায়তা ও অনুদান নিয়েই চলে। ’

ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সদস্য ফরম পূরণ করে দলে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি চালু হলেছিল, আগামী অক্টোবরে আবারও চালু করা হবে। সদস্য ফরমের মাধ্যমে দলে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে সংগঠনের জন্য ভালো হবে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই ছাত্রলীগ পরিচালিত হয়। কমিটি গঠনের পর দুইবার সভা হয়েছে। অন্যগুলোও গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই করা হবে। ’


মন্তব্য