kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জামানতের হিসাবও রাখবে সিআইবি

আবুল কাশেম   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জামানতের হিসাবও রাখবে সিআইবি

অর্থ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জাতীয় পার্টির নেতা শওকত চৌধুরী এমপি বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর শাখা থেকে ৫৫ কোটি টাকা ঋণ নেন। ওই ঋণের বিপরীতে জমি বন্ধক রাখেন তিনি।

আবার ওই একই সম্পত্তি বন্ধক রেখে ও ভুয়া আমানত দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে কমার্স ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেন ৯৩ কোটি টাকা, যা সুদাসলে ১২০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। জালিয়াতির দায়ে নীলফামারী-৪ আসনের ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে গত মে মাসে বংশাল থানায় মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান যমুনা এগ্রো কেমিক্যাল কম্পানি এই ঋণ জালিয়াতি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনেও একই জমি দুই ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখার তথ্য উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে শওকত চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘বেসিক ব্যাংকে বন্ধক রাখা সম্পত্তি ভুলক্রমে কমার্স ব্যাংকেও বন্ধক রাখা হয়েছিল। বাস্তবে ওই একই দাগে আমার আরো সম্পত্তি রয়েছে, যেগুলো কমার্স ব্যাংকে বন্ধক রাখার ইচ্ছা ছিল। ’

আইন অনুযায়ী, একই সম্পত্তি একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রাখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তা সত্ত্বেও জালিয়াতচক্রের প্রতারণা থামছে না। তাই ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে এ ধরনের জালিয়াতি করতে না পারে, সে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) ঋণ তথ্যের পাশাপাশি জামানত বা বন্ধকীর তথ্যও সংরক্ষিত রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেও এ ব্যাপারে সম্মতি দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) মহাব্যবস্থাপক আবু ফরাহ মো. নাছের এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা গত ২ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক বিদ্যমান আইনের আওতায়ই দেশের ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে নেওয়া জামানতের ওপর একটি তথ্যভাণ্ডার গঠন করতে পারে বলে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে।

সিআইবিতে গ্রাহকের ঋণ তথ্য থাকে। কোনো গ্রাহক কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ঋণ গ্রহণের পর সেই তথ্য সিআইবিতে পাঠায় ওই প্রতিষ্ঠান। ঋণ ঠিকমতো পরিশোধ করা হচ্ছে কি না, খেলাপি হয়েছে কি না, সে তথ্যও সংরক্ষিত থাকে সিআইবিতে। কোনো ব্যক্তি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে গেলে তার আবেদনটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিআইবিতে পাঠিয়ে যাচাই করে যে ওই গ্রাহকের নামে আর কোন কোন ব্যাংকে কী পরিমাণ ঋণ রয়েছে, কোনো খেলাপি ঋণ আছে কি না। সাধারণত কোনো ব্যাংকে খেলাপি হলে অন্য ব্যাংক ওই গ্রাহককে ঋণ দেয় না। এখন জালিয়াতি প্রতিরোধে সিআইবিতে ঋণ তথ্যের পাশাপাশি ওই ঋণের বিপরীতে গ্রাহকের দেওয়া জামানতের তথ্যও সংরক্ষণ করা হবে। ফলে একই জামানত দিয়ে কোনো গ্রাহক নতুন করে ঋণ নিতে গেলে তা সিআইবির তথ্যে ধরা পড়বে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তখন আর ঋণ দেবে না।

বিআরপিডির মহাব্যবস্থাপক আবু ফরাহ মো. নাছের বলেছেন, ঋণের জামানতের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার না থাকায় প্রায়ই জামানতসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ বা আপত্তি পাওয়া যায়। মিথ্যা জামানত বা একই জামানতের অসত্য তথ্য উপস্থাপন করে প্রতারণার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের সরেজমিন পরিদর্শনে বিভিন্ন সময় উদ্ঘাটিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ঋণতথ্যের মধ্যে জামানতের বিস্তারিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করলে অসত্য কাগজপত্র দাখিল করে ঋণ নেওয়া বা একই দলিল দিয়ে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ ও আশঙ্কা অনেকটা হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে ঋণ শৃঙ্খলারও উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।

ব্যাংকিং খাতে ঋণের নামে অর্থ হাতিয়ে নিতে জামানত নিয়ে নানাভাবে জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে প্রতারকচক্র। ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই জমিসহ কারখানা, বসতবাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তি বন্ধক রাখেন। ব্যক্তি শ্রেণির ঋণগ্রহীতারাও সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেন। এসব ক্ষেত্রে জালিয়াতচক্র একই জমি গোপনে একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রাখছে। এসব ক্ষেত্রে ওই ঋণ আর পরিশোধ করতে আগ্রহী হয় না গ্রাহক। ব্যাংক দুটিও ওই একই সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে বসে। ফলে তা আর বিক্রিও করা যায় না।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শফিকুল আলমের নগরের পাহাড়তলীর উত্তর কাট্টলী এলাকায় নিজের ও স্ত্রীর নামে ৪৫ দশমিক ৪৭ শতক জমি রয়েছে। বর্তমানে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায় বন্ধক আছে ওই জমি। ২০০৭ সালে একদিন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে তাঁকে ঋণ পরিশোধের নোটিশ দেওয়া হয়, যদিও ওই ব্যাংক থেকে কখনোই ঋণ নেননি শফিকুল আলম। পরে তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানতে পারে যে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির নামে জমির ভুয়া দলিল দিয়ে চট্টগ্রামের দুটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে এক প্রতারক। পরে যাচাই করে দেখা গেছে, ২০০৪ সালের ১২ মে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে তিন কোটি এবং একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর পূবালী ব্যাংক বন্দর শাখা থেকে প্রায় চার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে ওই জমির বিপরীতে। ১১ বছরে তা সুদাসলে ২০ কোটি টাকা হয়েছে, যার পুরো দায় চেপেছে শফিকুল আলমের ওপর। শফিকুল আলম নামের একজন আগ্রাবাদের এক প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা দেখিয়ে দুটি ব্যাংক থেকে ওই ঋণ নিয়ে উধাও হয়ে গেছে, ওই ঠিকানায় এ নামে কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। ঋণ কেলেঙ্কারির দায়ে আলোচিত বিসমিল্লাহ গ্রুপ বিভিন্ন নামে ভুয়া কম্পানি ও সম্পত্তির জাল দলিল তৈরি করে ব্যাংক থেকে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।  

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ৪ অধ্যায়ে ব্যাংকগুলো থেকে ঋণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া আছে। তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। তবে সিআইবির ঋণ তথ্যের ছকে জামানতের প্রকৃতি ও তার আর্থিক মূল্য সম্পর্কে কিছু তথ্য থাকলেও তা পূরণ করা ব্যাংকগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ফলে ব্যাংকগুলো জমির ক্ষেত্রে দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও পরিমাণ সংরক্ষণ করে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ৪২ (সি) ধারা অনুযায়ী, ক্রেডিট ইনফরমেশন বা ঋণ তথ্য বলতে কোনো ব্যাংকের মঞ্জুরি করা সব ঋণ সুবিধা ও রক্ষিত জামানতের তথ্য বোঝাবে এবং ৪৩ (এ) ধারা অনুযায়ী ওই তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে উপযুক্ত মনে করে, সেভাবেই সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ সিআইবি প্ল্যাটফর্মে ঋণ তথ্যের ছকে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের বিপরীতে রক্ষিত জামানতের তথ্য সংগ্রহ করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য আইন সংশোধনের কোনো দরকার হবে না।

সিআইবিতে ঋণ তথ্যের পাশাপাশি জামানতের তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগকে ‘ভালো’ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, জালিয়াতি রুখতে এটিই যথেষ্ট নয়। জামানতের তথ্য সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে একই সম্পত্তি বন্ধক রেখে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পথ বন্ধ করা যাবে। কিন্তু কোনো জালিয়াত যদি ভুয়া দলিল দিয়ে ঋণ নিতে চায়, সে ক্ষেত্রে সিআইবির এই তথ্য কাজে লাগবে না। তাই ঋণের বিপরীতে যে দলিল বন্ধক রাখা হবে, তার সত্যতা আগে যাচাই করতে হবে। আর সে কাজটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে করতে হবে। তবে এটা ভালো যে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধে তত্পর হয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক প্রতারকচক্র সিআইবির তথ্যে ঋণখেলাপি থাকলেও নতুন করে কৌশলে ঋণ নিচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে। ইংরেজিতে নিজের নামের বানানে একটি বর্ণ এদিক সেদিক করেও অনেকে সিআইবির খেলাপি তথ্য লুকিয়ে ঋণ নিচ্ছে। একই পরিচালক বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি থাকার পরও নানা কায়দায় আবার ঋণ নিতে পারছে। এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধ করার জন্য আরো উদ্যোগ নিতে হবে। আবার অনেকে বিভিন্ন ব্যক্তির গ্যারান্টির ভিত্তিতে ঋণ নিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে গ্যারান্টারের তথ্যও সিআইবিতে রাখা যেতে পারে।


মন্তব্য