kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে দ্বন্দ্বে শিক্ষকরা

শরীফুল আলম সুমন   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে দ্বন্দ্বে শিক্ষকরা

সরকার প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ সরকারি করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে দুই দফায় ২৬৩টি বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণ করতে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।

কিন্তু জাতীয়কৃত কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি জাতীয়কৃত কলেজের শিক্ষকদের নন ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছে। আর জাতীয়করণের লক্ষ্যে অনুমোদিত কলেজ শিক্ষকরা সরকারি কলেজের শিক্ষকদের সমান সুবিধা দাবি করেছেন। পাশাপাশি যেদিন থেকে তাঁরা চাকরি শুরু করেছেন সেদিন থেকেই জ্যেষ্ঠতা গণনারও দাবি জানিয়েছেন। এ নিয়ে বিসিএস দিয়ে চাকরি পাওয়া শিক্ষক এবং জাতীয়করণের লক্ষ্যে অনুমোদিত হওয়া কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে।

জাতীয়কৃত কলেজ শিক্ষক-কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০০০-এ বলা হয়েছে, জাতীয়করণের আগে কোনো শিক্ষক চার বছরের কম চাকরি করলে সেই মেয়াদ গণ্য করা হবে না। কমপক্ষে চার বছর বা তার বেশি চাকরি করলে মোট চাকরিকালের অর্ধেক গণ্য করা হবে। আর কোনো শিক্ষকের সরকারি হিসাবে নিয়মিতকরণের আদেশ দেওয়ার তারিখ থেকে তার ক্যাডারের প্রভাষক পদে জ্যেষ্ঠতা গণনা করা হবে। তিনি ক্যাডারের প্রভাষক পদে নিয়োগকৃত সর্বশেষ কর্মকর্তার নিচে অবস্থান করবেন।

জানা যায়, বর্তমানে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষক বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও দপ্তরে চাকরিরত। আর নতুন ২৬৩টি কলেজ জাতীয়করণ হলে আরো প্রায় আট হাজার শিক্ষক সরকারি হবেন।

জাতীয়করণের লক্ষ্যে অনুমোদিত কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি নুরুন্নবী আকন্দ কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘সর্বশেষ ৩৪তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। এখন আগামী বছরে যদি ২৬৪ কলেজ সরকারিকরণ ও আমাদের চাকরি আত্তীকরণ হয় তাহলে আমাদের অবস্থান থাকবে তাদেরও নিচে। অথচ জাতীয়করণের লক্ষ্যে অনুমোদিত অধিকাংশ কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও সিনিয়র শিক্ষকদের চাকরিকাল শেষের দিকে। অনেকের চাকরিই আর মাত্র তিন-চার বছর বাকি আছে। অর্থাৎ আমাদের ছাত্ররা অনেকেই বিসিএস দিয়ে চাকরি করছেন। দীর্ঘ ২৫ থেকে ৩০ বছর চাকরি করার পর আমাদের চাকরি করতে হবে আমাদেরই ছাত্রদের অধীনে। তাই আমাদের দাবি, যেদিন থেকে চাকরি শুরু করেছি সেদিন থেকেই আমাদের জ্যেষ্ঠতা গণনা করা হোক। তবে আমাদের কলেজগুলো জাতীয়করণের লক্ষ্যে অনুমোদিত হওয়ায় আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। তাই এখন আমরা তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছি। আমাদের বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবেই আমাদের মানসম্মান হেয় হতে দেবেন না। ’ নুরুন্নবী আকন্দ গাজীপুরের শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কলেজের অধ্যক্ষ।

জানা যায়, জাতীয়করণের লক্ষ্যে অনুমোদিত কলেজ শিক্ষক সমিতি এরই মধ্যে আত্তীকরণ বিধিমালা-২০০০ বাতিল করে যুগোপযোগী বিধি প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে। সেখানে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো—শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে জাতীয়করণ করা কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যাপক ও টাইম স্কেল প্রাপ্ত সিনিয়র প্রভাষককে স্বপদে বহাল রেখে আত্তীকরণ করা; চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে সম্পূর্ণ চাকরিকাল গণনা করা; বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এমপিও এবং নন-এমপিও সব শিক্ষকের একইসঙ্গে আত্তীকরণ করা; এমপিওভুক্ত পাস কোর্স ডিগ্রিধারী ও তৃতীয় বিভাগ প্রাপ্ত শিক্ষকদেরও একই সঙ্গে আত্তীকরণ করা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) ড. মোল্লা জালাল উদ্দিন কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘আমরা এখন জাতীয়করণ নিয়ে কাজ করছি। আগে এ কাজটা শেষ করতে চাই। এরপর শিক্ষকদের আত্তীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। শিক্ষকদের আপত্তির বিষয়গুলো বা দাবি-দাওয়া তখন বিচার-বিবেচনা করে দেখা হবে। ’

তবে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এত দিন এমপিওভুক্ত ও বেসরকারি কলেজের নিয়োগপ্রক্রিয়া যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ ছিল। বেশির ভাগ শিক্ষক টাকার বিনিময়ে নিয়োগ পেয়েছেন। অদক্ষরাও টাকা দিয়ে সহজেই নিয়োগ পেয়ে গেছেন। অথচ এসব শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণের পর যদি তাঁরা সরাসরি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হন তাহলে মেধার কোনো মূল্য থাকবে না। কারণ বিসিএস দিয়ে চাকরি পাওয়া শিক্ষকদের প্রায় সবাই মেধাবী। কয়েক লাখ প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। অথচ সবাই এখন একই মর্যাদা পাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। আর জাতীয়করণ করা কলেজ শিক্ষকদের সরাসরি ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করলে বদলি ও পদোন্নতিতেও নানা জটিলতার সৃষ্টি হবে।

শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা আরো জানান, আগে সাধারণত বেছে বেছে দেশের ভালো কলেজগুলো সরকারি করা হতো। কিন্তু এবার একযোগে বিপুলসংখ্যক কলেজ সরকারি করায় অনেক অযোগ্য কলেজও তালিকায় ঢুকে গেছে। এমনকি একই উপজেলায় নামিদামি কলেজ থাকার পরও অযোগ্য কলেজ সরকারি হওয়ার তালিকায় আছে। মাত্র দুজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে, এমন কলেজের নামও রয়েছে। ফলে মানহীন কলেজগুলো সরকারি হলে সেসব কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।   

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘সরকারের জাতীয়করণ নীতির সঙ্গে আমরাও একমত। তবে জাতীয়করণ হওয়া কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তি আমরা মেনে নেব না। বিশেষ করে বিসিএস ক্যাডারের জুনিয়র শিক্ষকরা এটা নিয়ে খুবই চিন্তায় আছে। জাতীয়করণ হওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে আমাদের সঙ্গে মিলিয়ে দিলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, মারামারি হবে। পদোন্নতি ও বদলিতে ঝামেলার সৃষ্টি হবে। তবে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকরা বদলি হতে পারবেন না বলে প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে অনুশাসন দিয়েছেন। যেহেতু একবারে আট থেকে দশ হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারি হবে, তাই এখন আমরা চাই আত্তীকরণ বিধিমালা-২০০০ সংশোধন করে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের নন ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। সেখানে তাদের সুবিধা বাড়ানো হোক। আর নন ক্যাডারে রেখে যদি তাদের শতভাগও জ্যেষ্ঠতা গণনা করা হয় তাতেও আমাদের কোনো আপত্তি নেই। ’


মন্তব্য