kalerkantho


নব্য জেএমবির আড়ালে সক্রিয় হচ্ছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো!

সরোয়ার আলম   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নব্য জেএমবির আড়ালে সক্রিয় হচ্ছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো!

নিষিদ্ধ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির আড়ালে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। হুজির শীর্ষ নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা বখতিয়ার, জেএমবির মাওলানা মনিরুল ইসলাম, মাওলানা রমজান আলী, মাওলানা রহিম ও মাওলানা জনি সংগঠনগুলোকে জাগিয়ে তোলার পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন। বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে থেকে তাঁরা এসব তত্পরতা চালাচ্ছেন। গোয়েন্দারা এমন তথ্য পেয়েছেন।

গোয়েন্দারা বলছেন, গ্রেপ্তার জঙ্গিরা র‌্যাব-পুলিশকে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর পলাতক সদস্যরা সক্রিয় আছে। তাদের জন্য বিদেশ থেকে অর্থ আসছে। কোনো সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন জঙ্গি নেতারা। এসব তথ্য পেয়ে র‌্যাব ও পুলিশ ঢাকাসহ সারা দেশে জঙ্গি আস্তানার সন্ধানে নেমেছে। ইতিমধ্যে ঢাকার আশপাশে বেশ কয়েকটি আস্তানার সন্ধান পাওয়া গেছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। সেগুলো কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।         

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, নব্য জেএমবির আলোচনার আড়ালে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো ফের জেগে উঠতে পারে।

এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো কঠোর ও সতর্ক থাকতে হবে। জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের মাত্রা আরো বেগবান করতে হবে। বিদেশে পালিয়ে থাকা জঙ্গি নেতাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, গুলশানসহ কয়েকটি স্থানে জঙ্গি হামলার পেছনে সরাসরি কাজ করেছে নব্য জেএমবি। এখন নব্য জেএমবি নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। তবে এর আড়ালে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো যাতে ফের জেগে উঠতে না পারে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে গোয়েন্দা নজরদারি ব্যাপক হারে বাড়ানো হয়েছে। জঙ্গিদের স্থান বাংলাদেশে নেই। জঙ্গিদের যারা অর্থ দিয়ে সহায়তা করছে তাদেরও অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। যেসব জঙ্গি নেতা দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার তিন জঙ্গিকে যেকোনো সময় দেশে আনা হবে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, নব্য জেএমবি বা আগের জেএমবি বুঝি না, যারাই জঙ্গিবাদের নামে দেশে অরাজকতার পাঁয়তারা করবে, তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। তবে নব্য জেএমবির আড়ালে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে। দেশে বা বিদেশে আত্মগোপনে থাকা জঙ্গিদের ধরার চেষ্টা চলছে। জামিনে থাকা জঙ্গিদের ব্যাপারেও নজরদারি করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, নব্য জেএমবির আড়ালে অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলো সুযোগ নিতেই পারে। তারা লাইম লাইটে আসার চেষ্টা চালাবে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে জঙ্গি ধরার সফলতা দেখাচ্ছে, তাতে জঙ্গিরা আর বড় ধরনের হামলা চালানোর সাহস পাবে না। এ জন্য র‌্যাব-পুলিশের অভিযান আরো কঠোর করতে হবে। জঙ্গিদের আস্তানাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। তাদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর ব্যাপারে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ শেষ হয়ে গেছে তা মনে করলে ভুল হবে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যেসব জঙ্গি নেতা বিদেশ থেকে কলকাঠি নাড়ছে তাদের ধরতে কূটনৈতিক তত্পরতা চালাতে হবে সরকারকে।

আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জঙ্গিবাদকে চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব না। সামাজিক আন্দোলন করে জঙ্গিদের প্রতিরোধ করতে হবে। নব্য জেএমবি ছাড়াও অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোকে নজরদারি করতেই হবে। না হলে তাদের জেগে ওঠার আশঙ্কা আছে। পুলিশ ও র‌্যাবের জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলমান রাখতে হবে।

গত ১ জুলাই গুলশানে জঙ্গি হামলার পর সারা দেশে জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। একের পর এক জঙ্গিদের আস্তানার সন্ধান পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে ৩২ জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে একাধিক জঙ্গি নেতাকে। তারা সবাই নব্য জেএমবি সদস্য বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নব্য জেএমবির সঙ্গে আন্তর্জাতিক কানেকশন আছে বলে তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থাগুলো। তবে সম্প্রতি নব্য জেএমবি নিয়ে আলোচনা বেশি হওয়ায় নিষিদ্ধ অন্য ছয় জঙ্গি সংগঠন আড়ালে থেকে তত্পরতা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে। এ প্রসঙ্গে একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা আত্মগোপন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আমরা সতর্ক আছি। হুজি, জেএমবি ও এবিটির সদস্যরা খুবই ভয়ংকর। শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মুফতি আবদুর রউফ, মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা বখতিয়ার, মাওলানা মনিরুল ইসলাম, মাওলানা রমজান আলী, মাওলানা রহিম, মাওলানা জনি, শহীদ মিয়া, মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন। তাঁরা সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। বিদেশ থেকে অর্থ পাঠিয়ে সংগঠনগুলোকে সহায়তা করছেন তাঁরা।

সূত্র জানায়, পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান, তেহরিক-ই-ইসলামী, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির কিছু নেতাকর্মী বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করছে। এবিটির কিছু নেতার সঙ্গে লস্কর-ই-তৈয়বা ও তেহরিক-ই-ইসলামের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে। জসিম উদ্দিন রাহমানী ধরা পড়ার পর সংগঠনের অপারেশনাল দায়িত্বে আছেন ইজাজ হোসেন। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি নাগরিক। এর আগে ইজাজ হোসেন জামায়াতুল মুসলিমিনের বাংলাদেশের আমির ছিলেন। তাঁর পাশাপাশি আনসারুল্লাহর আন্তর্জাতিক আমির হচ্ছেন জর্দানের বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক শেখ আবু ইসা আলী আররিফাই আল হাশেমী আল কোরাইশি-ই-আবু ইসা। তিনি ২০০২ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তারপর থেকে লাপাত্তা। এবিটির নেতা তেহজীব, রেজওয়ান শরীফ, মইনউদ্দিন শরীফের সঙ্গে আল-কায়েদা নেতা আনোয়ার আল আওলাকির ঘনিষ্ঠ সহযোগী সামির খানের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। এসব নেতার সঙ্গে বিদেশে পলাতক জঙ্গি নেতাদের সুসম্পর্ক আছে। পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার এড়াতে জঙ্গিরা বিভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তারা ঢাকার আশপাশে ছদ্মনামে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। গাজীপুরের পাতারটেকে পুলিশের অভিযানে নিহত সাত জঙ্গিও ছদ্মনামে বাসা ভাড়া নিয়েছিল।

ডিবির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, নব্য জেএমবির আরো ১১ জঙ্গি নেতা ঢাকার আশপাশের জেলায় আস্তানা গেড়েছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তার এড়াতে জঙ্গিরা এখন নানা কৌশল অবলম্বন করছে। তবে তাদের কোনো কৌশলই কাজে আসছে না।


মন্তব্য