kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টঙ্গীর টাম্পাকো দুর্ঘটনা

উদ্ধার অভিযান শেষ আটজন শনাক্ত হয়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর ও টঙ্গী প্রতিনিধি   

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



উদ্ধার অভিযান শেষ আটজন শনাক্ত হয়নি

গাজীপুরের টঙ্গীতে টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় উদ্ধার অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এক মাসের এই উদ্ধার অভিযানে পাওয়া গেছে ৩৯টি লাশ, যাদের মধ্যে ৩১ জনের পরিচয় মিলেছে।

এখনো আটজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া যে হাড় ও দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো কার সেটাও জানা যায়নি।

এদিকে এই দুর্ঘটনায় নিহত আসমা নামের এক পথচারীর লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে। তাঁর নাম নিহতদের তালিকায় রাখা হয়নি।

গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টাম্পাকোর ফয়েলস কারখানার পাশে স্থাপিত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম আলম উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তিনি কারখানাটিতে বিস্ফোরণ ও আগুন লাগা এবং পরবর্তী উদ্ধার অভিযানের বিভিন্ন তথ্য সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর সদস্য ও ফায়ার সার্ভিস নিশ্চিত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে আর কোনো মৃতদেহ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই উদ্ধারকাজ সমাপ্ত করা হলো। ’ উদ্ধারকাজ সফলভাবে পরিচালনার জন্য তিনি সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিটি করপোরেশন, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ, সেনাবাহিনীর ১৪ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের লেফটেন্যান্ট কর্নেল শফিবুল আজম, ফায়ার সার্ভিসের গাজীপুরের সহকারী উপপরিচালক আক্তারুজ্জামান লিটন, শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান প্রমুখ।

জেলা প্রশাসক জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর ভোরে টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় বিস্ফোরণ, আগুন ও ভবন ধসের ঘটনা ঘটে। প্রথমে ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান শুরু করে। এরপর ১২ সেপ্টেম্বর উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় সেনাবাহিনী। এক মাসের উদ্ধার অভিযানে ৩৯টি লাশ, কিছু দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ৩৬ জনকে আহতাবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। অনেকে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।

বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড : টাম্পাকো ফয়েলস কারখানাটির মালিক সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনের বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মকবুল হোসেন লেচু মিয়া। কারখানাটিতে সিগারেট, গুঁড়ো দুধ, চিপসসহ বিভিন্ন পণ্যের প্যাকেটের ফয়েলস তৈরি করা হতো। কোরবানির ঈদের মাত্র তিন দিন আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর কারখানাটিতে বিস্ফোরণের পর আগুন লাগে। বিধ্বস্ত হয় প্রশাসনিক ভবনসহ চারটি ভবন। খবর পেয়ে গাজীপুর ও ঢাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের ২৪টি ইউনিট এসে আগুন নেভানো ও উদ্ধার তত্পরতা শুরু করে। উদ্ধার তত্পরতার প্রথম দিন ২৪টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, তারা কারখানাটির শ্রমিক-কর্মচারী, পথচারী ও রিকশাচলক। আগুনে পুড়ে ও ভবন ধসে তাদের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় আহত হয় ৩৬ জন। পরদিন আরো চারটি লাশ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তী সময়ে আহতদের মধ্য থেকে কয়েকজনের মৃত্যু ও দুর্ঘটনাস্থল থেকে আরো লাশ উদ্ধার হয়। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৯।

এক মাসেও গ্রেপ্তার হয়নি মালিক : দুর্ঘটনার পরদিন নিহত শ্রমিক জিহাদের বাবা বাদী হয়ে কারখানার  মালিক সৈয়দ মকবুল হোসেনসহ সাতজনের নামে টঙ্গী থানায় মামলা করেন। ১৮ সেপ্টেম্বর আরো একটি মামলা করে পুলিশ। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও মালিকসহ কোনো আসামিই গ্রেপ্তার হয়নি। এ নিয়ে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন ভক্ত জানান, একাধিকবার অভিযান চালিয়েও আসামিদের কাউকে পাওয়া যায়নি। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

আর্থিক সহায়তা প্রদান : টঙ্গীতে টাম্পাকো দুর্ঘটনায় হতাহত শ্রমিকদের গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তাদের পরিবারকে ২০ হাজার এবং আহতদের ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল ব্যক্তিগত তহবিল থেকে দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনদের পাঁচ হাজার টাকা করে দিয়েছেন।

নিহতের তালিকায় ঠাঁই হয়নি আসমার : টাম্পাকো দুর্ঘটনায় নিহত পথচারী আসমার (২২) লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করে স্বজনরা। পরে নিহতদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন তাঁর বাবা আবদুল মতিন। কিন্তু নিহতের তালিকায় এখনো ঠাঁই হয়নি আসমার। প্রশাসন উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ গুটিয়ে নেওয়ায় সহায়তা পাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মতিন। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত সবার কাছে ছোটাছুটি করলেও কেউ কোনো সমাধান দিতে পারেননি।

আবদুল মতিন জানান, তাঁদের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার রউয়া গ্রামে। আসমা স্বামীর সঙ্গে টঙ্গীর মিরাশপাড়ায় থাকতেন, চাকরি করতেন বিসিক শিল্পনগরীর রেডিসন গার্মেন্ট কারখানায়। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মাত্র এক মাস ১০ দিন আগে আসমার বিয়ে হয়। ঈদের ছুটিতে স্বামীসহ আসমা বাড়ি যাচ্ছিলেন। বিসিক প্রধান সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় টাম্পাকোর ধসে যাওয়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান আসমা। অল্পের জন্য বেঁচে যান স্বামী সুমন মিয়া। পরে সুমন পথচারীদের সহযোগিতায় ভবনের নিচ থেকে টেনে আসমার লাশ বের করেন। সেখান থেকে লাশ মিরাশপাড়ার ভাড়া বাসায় নিয়ে যান এবং পরে গ্রামের বাড়ি নিয়ে দাফন করেন। পথে যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনের স্থানীয় মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের একটি প্রত্যয়নপত্র নিয়ে যান।

এসবের প্রমাণসহ গাজীপুর জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জমা দিয়ে নিহতদের তালিকায় মেয়ের নাম ওঠানোর জন্য ১৫-১৬ দিন আগে আবেদন করেন আবদুল মতিন।


মন্তব্য