kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাবনা মানসিক হাসপাতাল

রোগী মরলেও লাশ নেয় না পরিবার

আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস

আহমেদ উল হক রানা, পাবনা   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ভর্তির পর স্বজনরা একবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি এমন অনেক হতভাগ্য রোগী আছেন এই হাসপাতালে। তাঁদের মধ্যে দুজন গত বছর মারা গেছেন।

হাসপাতাল থেকে দুজনের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছিল। পরিবার লাশও নেয়নি। শেষে হেমায়েতপুর কবরস্থানে তাঁদের লাশ দাফন করা হয়। গতকাল রবিবার ও গত শনিবার পাবনা মানসিক হাসপাতাল ঘুরে এমন তথ্য মিলেছে।

আজ সোমবার পালন করা হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘মানসিক স্বাস্থ্যে মর্যাদাবোধ, সবার জন্য প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহযোগিতা’। দিবসটি উপলক্ষে হাসপাতালে গিয়ে মানসিক রোগীদের প্রতি পরিবারের অবহেলার এমন তথ্য উঠে এসেছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে হাসপাতালের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রোগী ছিলেন মাহবুব আনোয়ার। হাসপাতাল পরিদর্শন করতে আসা মানুষের কাছে একটাই আর্তি জানিয়ে আসছিলেন তিনি। কেউ তাঁর ওয়ার্ডের সামনে গেলে মাহবুব করুণ স্বরে ঠিকানা জানিয়ে বলতেন, ‘বাড়ির কাউকে খবর দেবেন, আমাকে যেন নিয়ে যায়। ’ মাহবুবের সেই আর্তি আর কেউ শুনবে না। তাঁর মৃত্যুর পরে লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মাহবুবের স্বজনদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে সাফ জানিয়ে দেয় তারা লাশ নেবে না। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ হেমায়েতপুর কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করে।

মাহবুবের মৃতুর পরদিন ১৩ নম্বর (মহিলা) ওয়ার্ডে মারা যান ছকিনা। অভিভাবক বা অন্য কেউ তাঁর মরদেহ গ্রহণ না করায় তাঁরও ঠাঁই মিলেছে হেমায়েতপুর কবরস্থানে।

হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে ২৩ জন হতভাগ্য রোগীর খোঁজ পাওয়া গেছে। এসব রোগীকে ভর্তির পর তাঁদের স্বজনরা কোনো দিন খোঁজ নিতে আসেনি। সুস্থ হওয়ার পরও তাঁরা রয়ে গেছেন অন্য রোগীদের সঙ্গে। কারণ তাঁদের স্বজনরা চায়নি ‘পাগল’কে পরিবারে ফিরিয়ে নিতে। মানসিক রোগ স্থিতিশীল হওয়ার পরও হাসপাতালে পড়ে আছেন ঢাকার বদিউল আলম (১০ বছর ধরে), শাহজাহান আলম (১২ বছর), কাজী আকরামুল জামান (২২ বছর), মহিউদ্দিন (১৪ বছর), শিপ্রা রাণী রায় (১৭ বছর), নাঈমা চৌধুরী (সাত বছর), গোলজার বিবি (১৭ বছর), নারায়ণগঞ্জের সাহিদা (২২ বছর), পাবনার সাঈদ হোসেন (২০ বছর), মিনহাজ (১৩ বছর), ডলি (পাঁচ বছর), জকিয়া সুলতানা (সাত বছর), শাহনারা আক্তার (১৭ বছর), চট্টগ্রামের আরজু বেগম (১২ বছর) ও গাজীপুরের নাজমা আক্তার (চার বছর)। তাঁদের বাইরে হাসপাতালের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৩২ বছর ধরে রয়েছেন আমেনা খাতুন। এই সময়ে কোনো স্বজন এক দিনের জন্যও তাঁর খোঁজ নিতে আসেনি। মানসিকভাবে অসুস্থ থাকার পাশাপাশি আমেনা খাতুন বাকপ্রতিবন্ধীও। একই ওয়ার্ডে আরেক বাকপ্রতিবন্ধী ঢাকার অনামিকা পড়ে আছেন ১৭ বছর ধরে। ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ২৭ বছর ধরে পড়ে থাকা ঢাকার মিরপুরের নাজমা নিলুফারের খোঁজ নেয়নি কেউ।

হাসপাতালের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স মায়া মণ্ডল বলেন, ‘সুস্থ হয়ে ওঠার পর রোগীরা তাঁদের স্বজনের কাছে যাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন। কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ করেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য। বাড়ি ফেরার জন্য তাঁরা অপেক্ষায় থাকেন প্রতিটি মুহূর্ত। স্বজনরা না আসায় বা প্রদত্ত ঠিকানা থেকে ফেরত নিয়ে আসার পর থেকে তাঁরা প্রচণ্ড হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে এই হতাশা থেকে তাঁরা আগের চেয়ে বেশি অসুস্থ হয়ে যান। ’

পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক তন্ময় প্রকাশ বিশ্বাস বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে পরিবারের সুস্থ সদস্যরা মানসিকভাবে অসুস্থ একজনকে এড়িয়ে চলে বা পরিবারে রাখতে চায় না। মানসিক ভারসাম্যহীনকে পরিবারের সদস্যরা বোঝা মনে করে। বাড়িতে পাগল আছে জানলে সামাজিক অবস্থান নষ্ট হবে—এমনটা ভেবেও অনেকে পরিচয় স্বীকার করতে চায় না ছেলে বা ভাইবোনদের। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। ’

৫৯ বছর একই বৃত্তে : ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাবনা মানসিক হাসপাতালের বয়স ৫৯ বছর। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ৫০০ রোগী বহির্বিভাগে আসে। অথচ সেখানে চিকিৎসক মাত্র পাঁচজন। হাসপাতালের পরিচালক জানান, মোট ৫৪২টি পদের মধ্যে ১৮৯টি খালি। ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট, ডেন্টাল সার্জন, অ্যানেসথেসিস্ট, আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট পদে কোনো লোক নেই। অভাব রয়েছে নার্সের। রোগীদের চার বেলা খাবারের জন্য জনপ্রতি বরাদ্দ মাত্র ১২০ টাকা। এই টাকায় একজন মানসিক রোগীর সুষম খাবার দেওয়া সম্ভব নয়।


মন্তব্য