kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দেড় লাখ একরের বেশি বনভূমি বেহাত

আরিফুর রহমান   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



দেড় লাখ একরের বেশি বনভূমি বেহাত

দেশে গত চার দশকে বনের প্রায় এক লাখ ৬৪ হাজার একর জমি দখল হয়েছে। বন বিভাগের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এতে বলা হয়েছে, রক্ষিত ও সংরক্ষিত এ দুই শ্রেণির মধ্যে সংরক্ষিত বন উজাড় হয়েছে বেশি। প্রতিবেদন মতে, প্রতিনিয়তই এখানে বন দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। বনের জমি দখল করে কেউ শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছে, কেউ বা আবার তৈরি করেছে সীমানা দেয়াল। শুধু বড় শিল্পপতিরাই না, বন দখলদারের তালিকায় আছে এলাকাবাসীও। তারা বনের জমি দখল করে বাড়িঘর ও দোকানপাট তৈরি করেছে। কেউ কেউ আবার বিলাসবহুল বাংলো তুলেছে বনের জমিতে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি সংস্থাগুলোও কম যায় না। বনের জমির বড় একটি অংশ দখল করেছে সরকারি সংস্থাগুলো।

গত ৪০ বছরে দেশে কী পরিমাণ জমি দখল হয়েছে তা নির্ণয় করতে সারা দেশ থেকে তথ্য নিয়ে বন বিভাগ এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। বন বিভাগ বলছে, বন উজাড় হয়ে যাওয়ায় হুমকির মধ্যে পড়ছে প্রাণিকূল। জীববৈচিত্র্যেও পরিবর্তন আসছে। বন রক্ষায় ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে তাই আজ রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন বিভাগের সদর দপ্তরে এক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক ডাকা হয়েছে।

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ৪০ বছরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এক লাখ ৬৩ হাজার ২৭৭ একর জমি বেহাত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জমি বেদখল হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এই অঞ্চল থেকে ৫০ হাজার একর জমি দখল করা হয়েছে। বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম এলাকা থাকায় সেখানে জমি দখলের পরিমাণ বেশি। বন উজাড়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বরিশাল বিভাগ। এই বিভাগ থেকে গত ৪০ বছরে ১৫ হাজার একর জমি জবরদখল করা হয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে আছে বগুড়া বিভাগ। এই বিভাগ থেকে দখল হয়েছে ১৪ হাজার একর। এর পরেই আছে ঢাকা বিভাগ।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বন দখলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গাজীপুরের শালবন, টাঙ্গাইলের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান এবং কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলের বনভূমি।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বড় শিল্পপতিদের পাশাপাশি সরকারি অনেক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বনের জমি নিচ্ছে। এতে বনের পরিমাণ কমে আসছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, এ পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ২৬ হাজার ৯১৭ একর জমি দখল করেছে, যেগুলো বন বিভাগের অধীনে ছিল।

পরিবেশবিদদের মতে, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য মোট আয়তনের ৩০ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ এখন মাত্র ৭ শতাংশ। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশে ১৫ শতাংশ বনভূমি রয়েছে।

বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বন আইনের ২৯ ধারার আলোকে রক্ষিত বন, আর ২০ ধারার আলোকে সংরক্ষিত বন নির্ধারণ করা আছে। এসব বনভূমি কাউকে দেওয়া যায় না। কিন্তু শিল্পায়নের নামে, বাড়িঘর নির্মাণের নামে প্রতিদিন বন বিভাগের জমি জবরদখল করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার জড়িত থাকারও অভিযোগ আছে। বন বিভাগের দাবি, বিশাল বনভূমি রক্ষায় যে পরিমাণ জনবল থাকা দরকার তা বন বিভাগে নেই। এ কারণে প্রভাবশালীরা বন দখল করতে এলে তাদের সঙ্গে পেরে ওঠে না বন বিভাগ। তা ছাড়া মামলা করেও কোনো লাভ হয় না।

উপপ্রধান বন সংরক্ষক শফিউল আলম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, দিন দিন মানুষের চাহিদা বাড়ছে। মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে বনের ওপর। তিনি বলেন, শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে অনেক শিল্পপতি বনের জমি দখল করছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বনের জমি বেহাত হওয়ার পেছনে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টিও আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ’ শফিউল আলম আরো বলেন, ‘বন রক্ষায় আমাদের জনবলের অভাব আছে। জনবল বাড়ানো জরুরি। ’

এদিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন সায়েন্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকার পাশে গাজীপুরে গত এক দশকে শতকরা ৭৯ ভাগ সরকারি জমি বেহাত হয়েছে। এসব জমি দখল করেছে শিল্পপতি ও স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজীপুরে বন বিভাগের জমির পরিমাণ ছিল ৬৬ হাজার ৮০০ একর। এক দশক আগেও জেলার মোট জমির শতকরা প্রায় ১৪ ভাগই ছিল বনাঞ্চল। এখন তা নেমে এসেছে মাত্র শতকরা ৩ ভাগে। মোট বনাঞ্চলের শতকরা ৭৯ ভাগ অর্থাৎ ৫২ হাজার একরেরও বেশি বন উজাড় বা দখল হয়ে গেছে।


মন্তব্য