kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মাদক কারবারির তালিকা নেই

এস এম আজাদ   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মাদক কারবারির তালিকা নেই

দেশে মাদক কারবারির সংখ্যা জানা নেই খোদ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কাছেই। সংশ্লিষ্ট কারোরই জানা নেই মাদকসেবীর সংখ্যাও।

যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই বলছেন, মাদক কারবার ও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে তাদের সংখ্যা জানা গুরুত্বপূর্ণ। ১০ বছর আগের ফ্যামিলি হেলথ ইন্টারন্যাশনালের এক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অনেকে দাবি করছেন, দেশে এখন মাদকসেবীর সংখ্যা ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে প্রায় এক লাখ পেশাদার মাদক কারবারি আছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাদক কারবারের কৌশল ও বাজার বেড়েছে। ডিএনসির ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আট বছরে দেশে ফেনসিডিলের চাহিদা কিছুটা কমলেও ইয়াবার বিস্তার বেড়েছে ৯ হাজার ১৪৯.৫ শতাংশ। ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে এক বছরে বিস্তারের হার ২১১.২২ শতাংশ।

জাতিসংঘের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির সূত্র মতে, যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধরা পড়ে তা বিক্রি হওয়া মাদকদ্রব্যের মাত্র ১০ শতাংশ। ধরা পড়ে না ৯০ শতাংশ মাদকদ্রব্য। গত বছর দেশে বিভিন্ন সংস্থা মিলে দুই কোটিরও বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে। সে হিসাবে, বাংলাদেশে প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে সেবনকারীদের হাতে যাচ্ছে প্রায় ১৮ কোটি ইয়াবা বড়ি।

অভিযান ও পরিসংখ্যানে ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্যের এমন ভয়ংকর বিস্তারের তথ্য উঠে এলেও তা নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো বিশেষ পদক্ষেপ। দুই বছর আগে কক্সবাজার এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছিল। এরপর ইয়াবার বড় কারবারিরা গা ঢাকা দিয়েই কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

ডিএনসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করতে দেশে মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, মাদকের ঝুঁকিসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসহ কিছু বিষয়ে তালিকা বা তথ্য থাকা দরকার। অধিদপ্তরে এমন কিছু নেই। তালিকা থাকলে মনিটরিং ও অভিযান চালানো সম্ভব হয়। নিত্যনতুন মাদকদ্রব্য বাড়লেও সেগুলো তালিকাভুক্ত করা হয়নি। ’ ওই কর্মকর্তা জানান, ফ্যামিলি হেলথ ইন্টারন্যাশনালের ২০০৭-০৮ সালের এক তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ মাদকসেবী ছিল। আট বছরে সেখানে আরো ২০ লাখ বেড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা জানা নেই কারোরই। বিভিন্ন এনজিও মাদক কারবারির সংখ্যা একেক রকম বলছে। সেখানে কয়েক লাখ পর্যন্ত বলা হচ্ছে। তবে প্রতিবছর গড়ে ১০-১৫ হাজার বিক্রেতা মাদকদ্রব্যসহ ধরা পড়ছে। ইউএনওডিসির সূত্র মতে, আরো ৯০ শতাংশ অধরা থাকছে। সে হিসাবে, দেশে অন্তত এক লাখ মাদক ব্যবসায়ী আছে।

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘বর্তমান ডিজি আসার পর মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের তালিকার ব্যাপারে গুরুত্ব দেন। দেশের প্রতিটি সার্কেল থেকে তালিকা চাওয়া হয়। প্রায় দুই হাজার ব্যবসায়ীর যে তালিকা পাওয়া গেছে সেটি অসম্পন্ন। কাউকে মাদক ব্যবসায়ী বলার মতো কোনো পূর্ব ইতিহাস নেই। এগুলো নিয়ে কাজ চলছে। ’

ডিএনসির কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, মাদকদ্রব্যের চাহিদা কমাতে সচেতনতা বাড়াতে নানা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। অভিযানও চলছে। মাদক কারবারিদের শনাক্ত করতে আগের খণ্ডিত তালিকা হালনাগাদ করার কার্যক্রমও হাতে নিয়েছে অধিদপ্তর। শনাক্ত করা হবে মাদকসেবীদেরও। তবে ডিএনসির দায়িত্বশীল একটি সূত্রে জানা যায়, এক বছর আগে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম এখনো সফল হয়নি। এ পর্যন্ত সারা দেশ থেকে প্রায় দুই হাজার মাদক কারবারির নাম সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এসব মাদক কারবারির বৃত্তান্ত নেই অধিদপ্তরের কোনো তথ্যভাণ্ডারে।

ডিএনসির মহাপরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো মাদকসেবী বা ব্যবসায়ীদের তেমন কোনো তালিকা নেই। তালিকা করার উগ্যোগ নিয়েছি আমরা। চাহিদা নিয়ন্ত্রণও মাদক নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি করে এবং সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমরা মাদকের চাহিদা হ্রাস করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি অভিযানও চলছে। ’

ডিএনসির পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) তৌফিক উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযান চলছে না, তা ঠিক নয়। এখন ৬৪ জেলায়, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তালিকা থাকলে এই অভিযান আরো বেগবান হবে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ সব সংস্থার সমন্বয়ে তালিকা তৈরি করা হবে। সব তালিকা নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের বর্তমানের অবস্থা ও তথ্য একীভূত করা হবে। ’

জানতে চাইলে ডিএনসির উপপরিচালক (চট্টগ্রাম মেট্রো) আলী আসলাম বলেন, ‘আমাদের লজিস্টিক সমস্যার কারণে সমুদ্রে অভিযান চালাতে পারি না। চার-পাঁচজন লোকবল নিয়ে এবং একটি গাড়ি নিয়ে পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল চালাতে হচ্ছে। ফলে অভিযান চালানো হলেও তা জোরদার করা যায় না। ’

গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সারা দেশে ৮০৭ জন ইয়াবা কারবারির তালিকা প্রকাশ করেছিল। তালিকাভুক্ত অধিকাংশই কক্সবাজারের উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফের বাসিন্দা। এর আগেও বিজিবি, ডিএনসি ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অভিযান চালানো হলেও কিছুদিন পর তা ঝিমিয়ে পড়ে।

ডিএনসির তথ্য মতে, এই অধিদপ্তর ২০১৫ সালে সারা দেশে ১০ হাজার ৫৪৮টি মামলা করে ১১ হাজার ৩০০ জনকে আসামি করেছে। ওই সময় ৩৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮০টি ইয়াবা বড়ি এবং ৩০ হাজার ৪২৯ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের ৯ মাসে সাত হাজার ৩০৫টি মামলা করেছে অধিদপ্তর, যাতে আসামি করা হয়েছে সাত হাজার ৭৯৩ জনকে। চলতি বছর উদ্ধার করা হয়েছে মাত্র ১৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৬টি ইয়াবা বড়ি এবং ১৮ হাজার ৮৮৮ বোতল ফেনসিডিল।

গত বছর সবচেয়ে বেশি (৯১ শতাংশ) ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে চট্টগ্রামে। মামলার সংখ্যাও সেখানেই বেশি (৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ)।

একটি সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারের মংডুতে বাংলাদেশ সীমানার ১০ কিলোমিটার ভেতরের দিকে ৩৯টি ইয়াবার কারখানা রয়েছে। নাফ নদ পেরিয়ে সড়ক ও নৌপথে ১৫টি রুটে ইয়াবা বড়ি পাচার করা হচ্ছে। এখনো সমুদ্রপথে ঢুকছে লাখ লাখ ইয়াবার চালান। এসব চালান টেকনাফ, কক্সবাজার, উখিয়া হয়ে চট্টগ্রামে যায়। কিছু চালান সেন্ট মার্টিনস ও শাহপরীর দ্বীপ হয়ে পাচার হচ্ছে। ডাঙায় ওঠার আগেই ইয়াবার চালানগুলো ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এসব চালানের দ্বিতীয় বাজার ঢাকা।


মন্তব্য