kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উত্তরাঞ্চলের চালের বাজার সিন্ডিকেটের কবজায়

দুই মাসে কেজিতে বেড়েছে ১২ টাকা, এখনো ঊর্ধ্বমুখী

লিমন বাসার, বগুড়া   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



দুই মাসে কেজিতে বেড়েছে ১২ টাকা, এখনো ঊর্ধ্বমুখী

বগুড়া শহরের গোদারপাড়ার সবচেয়ে বড় চালের বাজার। ছবি : কালের কণ্ঠ

চালের বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অব্যাহত আছে। চালের দাম গত দুই মাসে কেজিতে ১০ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

সুগন্ধি আতপ চালের দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। বগুড়া, নওগাঁ ও দিনাজপুরের চাল ব্যবসায়ী এবং চালকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে চালের দর বৃদ্ধির এই তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে সাধারণ ব্যবসায়ী ও কৃষকরা বলছে, বোরো ধান বাজারে ওঠার পর ধান সাড়ে চার শ থেকে পাঁচ শ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়। পাইকার আর বড় ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে কম দামে কৃষকের ধান নিজেদের কবজায় নিয়ে এখন ইচ্ছামতো চালের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে। আর বাম্পার ফলন ফলিয়ে কৃষকরা লগ্নি করা টাকাও তুলতে পারেনি। বাজারে সিন্ডিকেট করেই এখন চালের দাম বাড়িয়েছে তারা। নয়তো এখন বাজারে চালের দর বাড়ার মতো কোনো কারণ ঘটেনি।

খাদ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্রে জানা গেছে, এই মুহূর্তে সরকারি খাদ্যগুদামে মজুদ আছে ১৩ লাখ মেট্রিক টনের বেশি খাদ্যশস্য। মিল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের নিজস্ব গুদামে ধান চাল মিলিয়ে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টন শস্য মজুদ আছে।

আর কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এ বছর সারা দেশে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছিল। অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে বাম্পার ফলন হয়েছে। এ সময় উত্পাদন হয়েছে তিন কোটি টনের বেশি বোরো ধান। এ থেকে অন্তত দুই কোটি মেট্রিক টন চাল উত্পাদন করা সম্ভব।

বোরো মৌসুমের শুরু থেকে তিন মাস ধরে ধান ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকরা কম দামে দুই থেকে আড়াই লাখ টন ধান কিনে মজুদ করে। ধান ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকরা মোটা ধান ৪৫০ থেকে ৪৭০ টাকা এবং চিকন ধান ৫৮০ থেকে ৬৫০ টাকা মণ দরে ক্রয় করে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রাবণ মাস পর্যন্ত ধানের বাজার কম ছিল। এ সময় কৃষক প্রতি মণে কমপক্ষে ২০০ টাকা লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করেছে। ধান মজুদের পর চালকল মালিকরা নানা অজুহাতে চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এখন তাই হচ্ছে। চালের দাম বেড়েই চলেছে।

বগুড়ার নন্দীগ্রামের ফজলুর রহমান (৫৭) সাত বিঘা জমিতে, আদমদীঘির সামছুল আলম (৪৫) আট বিঘা জমিতে, নওগাঁর রানীনগরের আকবর আলী (৬০) ছয় বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসেই তারা লোকসানে ধান বিক্রি করেছে। এখন তাদের হাতে বিক্রির মতো বা চাল করার মতো কোনো ধান নেই।

নওগাঁর কয়েকজন চাল ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই হাজার চালকলের গুদামে এখনো প্রায় দেড় কোটি টন ধান মজুদ আছে। এই ধান দিয়ে টানা ১০ মাস ধরে চাল উত্পাদন করে যেতে পারবে চালকল মালিকরা।

নওগাঁ ও বগুড়ার বেশ কয়েকটি হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোটা ধান ৭৯০ থেকে ৮৫০ টাকা, চিকন ধান ৯২০ থেকে ৯৮০ টাকা পর্যন্ত মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব হাটের আড়তদাররা জানান, হাটে ও আড়তে ধানের আমদানি খুবই কম। মোটা ধান আমদানি শূন্যের কোঠায়। কিছু চিকন ধান বেচাকেনা হচ্ছে।

দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে কয়েকজন আমদানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বন্যা, খরা ও নানা বিপর্যয়ের পরেও ভারতে চালের দাম বাড়েনি। মোটা চাল প্রতি কেজি ১৭ থেকে ১৮ রুপি (বাংলাদেশি টাকায় ২০ থেকে ২১ টাকা কেজি), মাঝারি চাল প্রতি কেজি ২১ থেকে ২৪ রুপি (বাংলাদেশি টাকায় ২৫ থেকে ২৮ টাকা কেজি), সরু চাল প্রতি কেজি ২৬ থেকে ২৮ রুপি (বাংলাদেশি টাকায় ৩১ থেকে ৩৫ টাকা কেজি) দরে বিক্রি হচ্ছে।

বগুড়ার চালের পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুটি স্বর্ণা, হাইব্রিড পারিজা, বিভিন্ন রকম মোটা চাল ৫০ কেজির বস্তা দুই মাস আগে বিক্রি হয়েছে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকায় (২০ থেকে ২২ টাকা কেজি)। এখন বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮৫০ থেকে এক হাজার ৯৫০ টাকা বস্তা (৩৭ থেকে ৩৯ টাকা কেজি)। বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ দুই মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৫০ কেজির বস্তা এক হাজার ৬৫০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা (৩৩ থেকে ৩৪ টাকা কেজি), এখন বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮৫০ থেকে এক হাজার ৯৫০ টাকা বস্তা (৩৭ থেকে ৩৯ টাকা কেজি)। জিরাশাইল ও মিনিকেট আগে এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকায় প্রতি বস্তা বিক্রি হয়েছে (৩৬ থেকে ৩৮ টাকা কেজি), এখন বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ১০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা বস্তা (৪২ থেকে ৪৪ টাকা কেজি)। কাটারিভোগ আগে বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা কেজি, এখন বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা কেজি। জিরাকাটারি আগে বিক্রি হয়েছে ৬৫ টাকা কেজি, এখন বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা কেজি দরে। চিনিগুঁড়া আগে বিক্রি হয়েছে ৮৫ টাকা কেজি, এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে।

নওগাঁর পাইকারি চাল বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব ধরনের চালের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দুই মাস আগে গুটি স্বর্ণা, হাইব্রিড পারিজা, বিভিন্ন রকম মোটা চাল এক হাজার ৫০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হয়েছে (২০ থেকে ২২ টাকা কেজি)। এখন এসব চালের দাম বেড়ে প্রতি বস্তা এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৭৫০ টাকায় (৩৪ থেকে ৩৫ টাকা কেজি) বিক্রি হচ্ছে। বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ এখন বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮৫০ টাকা বস্তা (৩৭ টাকা কেজি), যদিও আগে বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৬৫০ টাকায় (৩৩ টাকা কেজি)। রণজিৎ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকা বস্তা (৪০ টাকা কেজি)। নাজিরশাইল আগে বিক্রি হয়েছে ৪২ থেকে ৪৪ টাকা কেজি দরে, এখন বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা বস্তা (৫০ থেকে ৫২ টাকা কেজি)। চিনিগুঁড়া আতপ আগে বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে, এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা কেজি। এসব চাল সবই অটোরাইস মিলের। বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার চাল ব্যবসায়ী গোলাম রাব্বানি ও মিল মালিক রতন কুমার জানান, অটোরাইস মিলের মোটা চাল আগে যা এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি হয়েছে, এখন তা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৭৫০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায় (৩৩ থেকে ৩৫ টাকা কেজি)। এ ছাড়া বিভিন্ন রকম মাঝারি চাল আগে এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা বস্তা (৩০ থেকে ৩২ টাকা কেজি) ছিল। এখন তা ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সরু চাল মিনিকেট বা জিরাশাইল আগে বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকা বস্তা (৩৬ থেকে ৩৮ টাকা কেজি)। এখন তা বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৩০০ টাকা বস্তা (৪৪ থেকে ৪৬ টাকা কেজি)।

চাল আমদানিকারক মো. আব্দুল মতিন সওদাগর জানান, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। দুই মাসের ব্যবধানে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজিতে বেড়েছে চালের দর। সরকার আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করলে বাইরে থেকে কম দামে চাল আসবে। চাল আমদানি হলেই দাম কমে যাবে।

মহিত সরকার নামের আরো একজন আমদানিকারক জানান, এ বছর বোরো মৌসুমে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে অতি কম দামে ধান কিনে মজুদ করেছে। পরে তারাই আবার চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যার কারণে হঠাৎ করে চালের বাজার দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত। একলাফে চালের দাম এর আগে কখনো এত বাড়েনি। একজন ব্যবসায়ী স্বীকার করেন যে তাঁরা মনে করেছিলেন, ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে বন্যা হওয়ায় চাল সংকট হবে। বাংলাদেশেও বন্যা হবে। তখন বন্যার অজুহাত দেওয়া যাবে। তিনি বলেন, ‘কিন্তু সৌভাগ্য যে বাংলাদেশে বন্যা হয়নি। তবে বন্যার পরেও ভারতে চালের দাম বাড়েনি। আমাদের এখানে ঠিকই বেড়েছে। ’

আমদানিকারকদের মতে, হঠাৎ চালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে চাল আমদানির ওপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করলে চাল আমদানি হবে। তাহলে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে।

চালকল মালিকদের একটি সূত্র জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলে ধান ও চালের দর নিয়ন্ত্রণ করেন নওগাঁর একজন বড় চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ী, মহাদেবপুরের চার-পাঁচজন চালকল মালিক, সান্তাহারের তিনজন চালকল মালিক, দিনাজপুরের ছয়জন চালকল মালিক, কুষ্টিয়ার সাত-আটজন চালকাল মালিক, বগুড়ার তিনজন চালকল মালিক। এঁরাই প্রতিবছর সিন্ডিকেট করে মৌসুমে খুব কম দামে ধান কিনে থাকেন। পুরো মৌসুম এ ব্যবস্থা চালু রাখার চেষ্টা করেন। ধানের মৌসুম শেষ হয়ে গেলে দু-তিন দফায় নানা অজুহাতে চালের বাজার বাড়িয়ে দেন তাঁরা। ছোট ছোট চালকল মালিকরাও তাঁদের অনুসরণ করতে বাধ্য হন। কয়েক বছর ধরে এ অবস্থা চলছে। এতে সাধারণ কৃষক ও স্বল্প আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লাভবান হন চালকল মালিকরা।


মন্তব্য