kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উন্নয়ন সহযোগিতায় জার্মানির বিপুল আগ্রহ

বার্লিনে বৈঠক চলতি মাসেই

আবুল কাশেম   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ইউরোপের বৃহৎ অর্থনীতির দেশ জার্মানি বিপুল সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশে উন্নয়ন ও সংস্কার কর্মসূচিতে চলতি বছরই দুই হাজার ২৭২ কোটি টাকা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।

স্বাধীনতা-পরবর্তী একটি চুক্তির আওতায় জার্মানি ইতিমধ্যে প্রায় ২১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঋণ ও অনুদান দিয়েছে। দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার পরিসর আরো বাড়াতে আগ্রহী তারা। এ জন্য চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বার্লিনে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশ-জার্মান নেগোসিয়েশন ২০১৬’ শিরোনামে আগামী ২৪ ও ২৫ অক্টোবর বার্লিনে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সে বৈঠকে আলোচ্যসূচির একটি খসড়া জার্মান সরকার ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে দিয়েছে। জার্মানির ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিএমজেড) দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান ড. উলফ্রাম ক্লেইন স্বাক্ষরিত ওই খসড়াটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে মতামত চেয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। ওই সব মতামতের ভিত্তিতে আগামী ১০ অক্টোবর আন্তমন্ত্রণালয় সভা করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবে বাংলাদেশ। বার্লিনের ওই বৈঠকে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবেন ইআরডির সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইআরডির এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে জার্মানি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে আগ্রহী। আর বাংলাদেশ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী দেশের তুলনায় জার্মানিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। ইউরোপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা জার্মানি। দেশটির সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতার সম্পর্ক উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে বাংলাদেশও আন্তরিক।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জার্মানির সঙ্গে ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট ফর ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন’ চুক্তি সই হয়। এর আওতায় দেশটি বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়তা করে আসছে। ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত জার্মানি বাংলাদেশকে মোট ২৪৫ কোটি ৪৭ লাখ ইউরো ঋণ ও অনুদান দিয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আর চলতি বছরই দেশটি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে ২৫ কোটি ৮২ লাখ ইউরো বা প্রায় দুই হাজার ২৭২ কোটি টাকা সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা হিসেবে এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ কারিগরি সহায়তা হিসেবে দেবে দেশটি। তবে এসব অর্থ ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই খরচ করতে হবে বলে বাংলাদেশকে শর্ত দেওয়া হয়েছে। আর জার্মানির অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পেলে অর্থ ফেরত নেবে দেশটি।

গত মে মাসে ঢাকায় একটি বৈঠক করেছেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই উত্পাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা, মানবাধিকার সুরক্ষা ও বিচার বিভাগ সংস্কার, টেকসই জ---ালানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ অর্জনে জার্মানি বাংলাদেশকে সহায়তার প্রস্তাব করেছে। আর বাংলাদেশে কর্মরত জার্মান উন্নয়ন সংস্থা কেএফডাব্লিউ, জিআইজেড এবং বিজিআর কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়েছে দেশটি। জার্মান সরকার চাইলে তাদের কর্মীদের নিরাপত্তায় বুলেটপ্রুফ গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ।

সূত্র জানায়, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ---ালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (শ্রেডা) আরো শক্তিশালী করতে চায় জার্মানি। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য মানসম্পন্ন বিদ্যুত্সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উত্পাদন বাড়ানো, উপযুক্ত ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আগ্রহী জার্মানি। এ ছাড়া অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ খাত গড়ে তুলতে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে চায় তারা। সৌরবিদ্যুৎ উত্পাদন করে তা জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিতরণ করতে কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।

বাংলাদেশে সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নে আগেই গুরুত্ব দিয়েছে জার্মানি। আদালতে মামলাজট কমাতে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক আয়োজন করায় জার্মান সরকার বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছে, বিনা বিচারে জেলে বন্দিদের সংখ্যা কমাতেও আইন মন্ত্রণালয় কাজ করছে। কারাগার সংস্কারে আন্তর্জাতিক মান অর্জনে আরো অনেক কিছু করণীয় রয়েছে। পোশাক খাতের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা করবে দেশটি। এ ছাড়া দুই দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একে অন্যের বিশেষজ্ঞ মতামত নেবে। প্রয়োজনে এক দেশ অন্য দেশের বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব দিতে পারবে। এ ধরনের কার্যক্রম সমন্বয় করবে কেএফডাব্লিউসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। তবে এ ক্ষেত্রে যে অর্থের প্রয়োজন হবে তা বহন করবে জার্মান সরকার। বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া বা তাঁদের দায়িত্ব দেওয়ার পর প্রাপ্ত ফলাফল উভয় দেশ পরের বৈঠকে উপস্থাপন করবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে ঢাকা ও বার্লিনে দ্বিপক্ষীয় সভা করার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।


মন্তব্য