kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জিডি করার পর দুই কিশোরকে নির্যাতন, লাখ টাকা জরিমানা

বরগুনা প্রতিনিধি   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জিডি করার পর দুই কিশোরকে নির্যাতন, লাখ টাকা জরিমানা

বরগুনার পাথরঘাটায় দুই কিশোরকে তাদের মায়েদের সামনেই অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। একটি দোকানে চুরির ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পর সন্দেহভাজন হিসেবে এ দুই কিশোরকে ধরে এনে নির্যাতন করা হয়।

গত শুক্রবার দুপুরে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের খলিফারহাট বাজারে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) তিন সদস্য দুই কিশোরকে নির্যাতন করার পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানাও করেছেন। তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় রাত ১০টার দিকে পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

ভুক্তভোগী পরিবার দুটির অভিযোগ, এসব শাস্তি দেওয়ার পরও দুই কিশোরের মায়ের কাছ থেকে সাদা কাগজ ও স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়েছে।

কিশোর দুজন হলো চরদুয়ানী ইউনিয়নের তাফালবাড়িয়া গ্রামের আবুল বাশারের ছেলে মো. রুবেল (১৪) ও একই গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে আনোয়ার (১৪)।

রুবেল খলিফারহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এবার নিম্ন মাধ্যমিক (জেএসসি) পরীক্ষা দেবে। আনোয়ার স্থানীয় একটি হাফেজি মাদ্রাসার ছাত্র।

ব্যবসায়ী ছগির হোসেনের সাধারণ ডায়েরি করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পাথরঘাটা থানার ওসি মো. জিয়াউল হক। তবে সন্দেহজনকভাবে দুই কিশোরকে আটক এবং তাদের মারধরের বিষয়ে পুলিশকে কিছু জানানো হয়নি বলে ওসি জানান। তিনি আরো জানান, আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারো নেই। ঘটনাটি তিনি খতিয়ে দেখবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১ অক্টোবর রাতে চরদুয়ানী ইউনিয়নের খলিফারহাট বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী ছগির হোসেনের ‘মায়ের দোয়া’ বস্ত্রালয়ে চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পাথরঘাটা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন ছগির হোসেন। গত শুক্রবার দুপুরে তিনি প্রথমে আনোয়ারকে (১৪) এবং পরে মো. রুবেলকে (১৪) সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেন। এরপর স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রহমানকে খবর দেন। পরে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ইউপি সদস্য কবীর মোল্লা ও মজিবর রহমান।

আনোয়ারের মা হাফিজা আক্তার সাংবাদিকদের জানান, তাঁর সামনেই ছেলেকে বেদম মারধর করেন ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মজিবর রহমান, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কবীর মোল্লা ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুর রহমান। তাঁর ছেলে যতই চুরির সঙ্গে জড়িত নয় বলে জানায়, ততই নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। পায়ের আঙুলে ঢোকানোর জন্য সুচ নিয়ে আসা হয়। নখ তুলে দেওয়ার জন্য আনা হয় প্লাস। নির্যাতন সইতে না পেরে একপর্যায়ে তাঁর ছেলে চুরির দায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়। একই সঙ্গে রুবেলের নাম বলতেও বাধ্য করেন তিন ইউপি সদস্য।

রুবেলের মা বুলবুলি বেগম জানান, ছেলের ওপর নির্যাতন হতে দেখে তাঁরা দিশাহারা হয়ে পড়েন। মারধরের পর রুবেল ও আনোয়ারকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন ইউপি সদস্যরা। এ ছাড়া তাঁকে ও আনোয়ারের মাকে পাঁচটি সাদা কাগজ ও স্ট্যাম্পে সই করতে বাধ্য করেন তাঁরা।

বুলবুলি বেগম বলেন, মায়ের সামনে ছেলের ওপর এমন নির্যাতন পৃথিবীর কোনো মা সহ্য করতে পারেন না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি ছেলেকে নির্যাতনমুক্ত করতে যে যেখানে বলেছে, সেখানেই সই দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমার ছেলে যদি অপরাধী হয়ে থাকে তবে তা দেখার জন্য আইন-আদালত, পুলিশ রয়েছে। পুলিশের হাতে সোপর্দ করলে বিনা দোষে তাঁদের ছেলেদের এমন নির্যাতনের শিকার হতে হতো না। ’

এ বিষয়ে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, যাদের মারধর করা হয়েছে তাদের মা-বাবা ভালো না। তাদের বংশেও এমন চোর রয়েছে। চুরির কথা তারা স্বীকার করেছে। জরিমানার টাকাও দেবে বলে তারা মেনে নিয়েছে।

চরদুয়ানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ফিরোজ জানান, চুরির ঘটনায় রুবেল ও আনোয়ারকে আটক করে মারধর করেছে স্থানীয় লোকজন। পরে তাদের ইউনিয়ন পরিষদে আনা হয়। তখন চুরির বিষয়টি স্বীকার করায় তাদের জরিমানা করা হয়।


মন্তব্য