kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাড্ডায় চাঞ্চল্যকর চার খুন

গার্মেন্টের ঝুটের ভাগের বিরোধে হত্যাকাণ্ড

এস এম আজাদ   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



গার্মেন্টের ঝুটের ভাগের বিরোধে হত্যাকাণ্ড

রাজধানীর বাড্ডায় জাতীয় শোক দিবস পালনের প্রস্তুতির সময় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ চারজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। বাড্ডা আদর্শনগরের স্টার গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসার টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

ঢাকা মহানগর উত্তরের ২১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন সুমন ওরফে বাউল সুমন ওই ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। গত বছরের রমজান মাসে কারাহেফাজতে থাকা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হলে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান সোহেল ওরফে গামা ওই ঝুট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে নেন। এটি মেনে নিতে পারেননি বাড্ডা থানা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক জুনায়েদ হোসেন জুয়েলসহ কয়েকজন। জুয়েল ওই ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিতে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সোহেল ওরফে গামাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। রীতিমতো দুই দফা বৈঠক করে জুয়েলসহ অন্যরা চারজনকে খুন করে। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে পাঁচজন সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে আরো ১১ জন অংশ নেয়। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সবাই বাড্ডায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, যাদের তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। সর্বশেষ গত ৩০ আগস্ট জবানবন্দি দিয়েছেন জুয়েল। এসব স্বীকারোক্তিতে হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। এরই মধ্যে হত্যায় ব্যবহৃত দুটি অস্ত্রও উদ্ধার করেছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, চার খুনের ঘটনায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর অস্ত্র আইনের দুই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছে পুলিশ। হত্যা মামলার তদন্ত এখন শেষ পর্যায়। সূত্র মতে, চার খুনে অন্তত চারটি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এখনো ধরা পড়েনি দুই শ্যুটার সোহেল রানা ও বিজয়। আরো অধরা আছে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী পাভেল এবং পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী শহীদ আহমেদ ওরফে পাঙ্কি রনি, ফাহাদ, জাহাঙ্গীর ওরফে কিবরিয়া ওরফে উজ্জ্বল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক ফজলুল হক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাড্ডার ফোর মার্ডারের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ১৬ জনের নাম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আমরা ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। তাদের মধ্যে আসামি জুয়েল, নয়ন ও নূরু আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। দুটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং এসব ঘটনার মামলারও চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ’ জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, ‘গার্মেন্টের ঝুটের টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে জুয়েলসহ কয়েকজন মিলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটনায়। এতে চার-পাঁচটি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। সারাসরি অংশ নেয় জুয়েল, নূরু, বিজয়, নয়ন ও পাভেল। বাকিরা সহায়তা করে। অপর আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। শিগগিরই মামলাটির তদন্তও শেষ হবে বলে আশা করছি। ’

গত বছরের ১৩ আগস্ট রাতে মধ্যবাড্ডার আদর্শনগরে ১৫ আগস্ট পালন উপলক্ষে বৈঠকরত অবস্থায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান সোহেল ওরফে গামা, ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামসুদ্দিন মোল্লা ও স্থানীয় আল-সামি হাসপাতালের ব্যবস্থাপক ফিরোজ আহমেদ মানিক। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ আগস্ট মারা যান থানা যুবলীগ নেতা ও গ্যারেজ মালিক আবদুস সালাম। নিহত গামার বাবা মতিউর রহমান ১৪ আগস্ট অজ্ঞাতপরিচয় ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা করেন। গত বছরের ১৬ আগস্ট বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের শিক্ষা, সাহিত্য ও পাঠাগারবিষয়ক সম্পাদক ফারুক হোসেন মিলন ও ছাত্রলীগের কর্মী নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত বছরের ২০ আগস্ট আসামি নূরু ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে যুবলীগকর্মী নয়ন ওরফে ডনকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনিও আদালতে স্বীকারোক্তি দেন।

সূত্র জানায়, গত ২৭ আগস্ট জুনায়েদ হোসেন জুয়েল, মোজাহিদুল ইসলাম নাহিদ, সাফায়েত উল্লাহ ওরফে সোহাগ, রাহাত হোসেন কাব্য, ইকবাল আহম্মেদ রানা ও শাহ পরান হোসেন রাজুকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বাড্ডা থানায় অস্ত্র আইনে দুটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দুটির অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্তকারীরা। একটি মামলায় জুয়েল ও নাহিদ এবং অন্য মামলায় জুয়েল, নাহিদ, রাজু, কাব্য, সোহাগ ও ইকবালকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন জুয়েল।

তদন্তকারীরা বলছেন, এই খুনের মামলায় আরো গ্রেপ্তার করা হয়েছে সৈয়দ মামুন, পারভেজ, শাওন বাবু, শাহজাহান, মিতা সুমন ও ফারুক মোল্লাকে। তাদের মধ্যে ফারুক মিলন, মামুন, পারভেজ ও শাওন বাবু জামিনে ছাড়া পেয়েছে।

জামিনে মুক্ত হওয়ার পর গত ১৭ আগস্ট ডেমরার বামইল মোল্লারটেকে ঝোপ থেকে পারভেজের গলাকাটা বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে ছিল পিকআপভ্যান চালক। ডেমরা থানার উপপরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস বলেন, পারভেজ তার এক বন্ধুর কাছে ৭০ হাজার টাকা পেত। ওই বন্ধুর বাড়ি বামইল এলাকায়। চার দিন আগে বন্ধুর কাছে পাওনা টাকা আনতে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় পারভেজ। ডিবির পরিদর্শক ফজলুল হক বলেন, ‘পারভেজ হত্যাকে প্রথমে চার খুনের হত্যাকারী গ্রুপটির অন্তর্কোন্দল বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে দেখা গেছে, ভিন্ন আরেকটি ঘটনায় নিহত হয়েছে পারভেজ। ’

তিন আসামির জবানবন্দি : নূরু, নয়ন ও জুয়েল আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার নেপথ্য কারণ ও পরিকল্পনার তথ্য দিয়েছে। তারা জানায়, মধ্যবাড্ডা আদর্শনগর এলাকার জলিলের মালিকানাধীন স্টার গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসার প্রায় ৯ লাখ টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে এলাকার দুটি গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এক পক্ষের নেতা বাউল সুমন মারা যাওয়ার পর অন্যপক্ষ ওই গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে গেলে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এ ছাড়া আফতাবনগরের কোরবানির পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধও মাথাচাড়া দেয়। এর জের ধরেই হত্যার ঘটনা ঘটে। আসামিরা জবানবন্দিতে বলে, বাউল সুমন ঝুট ব্যবসার টাকার একটি বড় অংশ তার সহযোগীদের মধ্যে ভাগ করে দিত। নিহত গামাও মাসে ২৫ হাজার টাকা করে পেত। একইভাবে নিহত আওয়ামী লীগ নেতা শামসুদ্দিন মোল্লা ও যুবলীগ নেতা সালামকে ১০ হাজার টাকা করে দিত সুমন। হঠাৎ করে সুমনের মৃত্যুর পর গামা নিজেকে সুমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দাবি করে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে টাকার ভাগ থেকে বঞ্চিত হয় জুয়েলসহ সুমনের অনুসারীরা। তারা গামাকে সরে যাওয়ার জন্য হুমকি দেয়। এরই মধ্যে গামা স্টার গার্মেন্ট থেকে এক দফা ঝুট কাপড় নিয়ে বিক্রি করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সুমনের অনুসারীরা তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। বর্ণনা অনুযায়ী, গত বছরের ১৩ আগস্ট ঘটনার দিন বিকেল ৩টার দিকে বাড্ডার বড়টেক এলাকার বালুরমাঠে চূড়ান্ত পরিকল্পনার বৈঠক হয়। এর আগের দিন বাউল সুমনের অফিসেও এক দফা বৈঠক হয়। সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নিয়ে গুলি ছোড়ে জুয়েল, সোহেল, বিজয় ও নয়ন। তাদের মধ্যে জুয়েলের গুলি গামার শরীরে বিদ্ধ হয়। গুলি ছোড়ার পর অস্ত্রগুলো অন্যদের কাছে রেখে পালিয়ে যায় শ্যুটাররা। ঘটনাস্থল থেকে খুনিদের সহায়তা করে পাভেল, নূরু, সৈয়দ মামুন, পারভেজ, ফারুক মোল্লা, ফারুক মিলন, ফাহাদ, জাহাঙ্গীর ওরফে কিবরিয়া ওরফে উজ্জ্বল, শাওন বাবু ও শাহজাহান।


মন্তব্য