kalerkantho


পরের ধনে পোদ্দারি

‘রাজ্য ও রাজরানি’ দখলে নিয়ে টিপুর উত্থান!

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



খুলনার আলোচিত ব্যবসায়ী টিপু সুলতান ছিলেন একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। প্রতিষ্ঠান মালিকের আস্থাভাজন হয়ে তিনি ব্যবসার কৌশল আয়ত্ত করেন। এর পাশাপাশি টিপু ওই ব্যবসায়ীর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। সেটা কাজে লাগিয়ে তিনি ওই ব্যবসায়ীকে ‘পাগল’ সাজিয়ে তাঁর সব সম্পত্তি দখলে নেন, বিয়ে করেন তাঁর স্ত্রীকে। ‘রাজ্য ও রাজরানি’ দখলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে উত্থান ঘটে বগুড়া থেকে খুলনায় আসা এই টিপু সুলতানের।

জনতা ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা রয়েছে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে। গত মার্চে তাঁকে গ্রেপ্তারের পর তিনি আবার আলোচনায় আসেন। তবে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে টিপু সুলতান কারাগার থেকে ছাড়া পান। কিন্তু পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগ তাঁর জামিন বাতিল করেন। তিনি এখন লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন।

খুলনার দৌলতপুরের এই বহুল আলোচিত ব্যবসায়ীকে নিয়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠে ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি ব্যবসায়ী মহল, তাঁর স্বজন ও পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলে। অনেকেই নিজে থেকে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে টিপু সুলতান সম্পর্কে নানা তথ্য দিয়েছেন। অনেকেই চান, এই প্রতারক ব্যবসায়ীর সাজা হোক। তবে স্বজনরা কেউই নিজেদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করতে চাননি। সবারই প্রায় অভিন্ন বক্তব্য, টিপুর টাকা আছে এবং ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সখ্য আছে। টাকা দিয়ে তিনি অনেক কিছুই করতে পারেন!

ব্যবসায়ী মহল ও তাঁর স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, টিপু সুলতানের আদি বাড়ি নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে। পরবর্তী সময়ে বগুড়ার উপকণ্ঠে নাটাইপাড়ায় বাড়ি করেন তাঁরা। এসব স্থানে তাঁর আত্মীয়রা এখনো আছে। খুলনায় থাকলেও নওগাঁ ও বগুড়ায় টিপুর নিয়মিত যাতায়াত আছে।

জানা যায়, জয়পুরহাটের আব্দুল হাইয়ের ছিল খুলনার স্টেশন রোডে রড-সিমেন্ট ও পণ্য আমদানির ব্যবসা। এই আব্দুল হাইয়ের সঙ্গে টিপু সুলতানের বাবার পরিচয় ছিল। আব্দুল হাই ১৯৭৮ সালে খুলনার দৌলতপুরে বিয়ে করেন। বাড়িও করেন। বাবার পরিচয়ের সূত্র ধরে এই আব্দুল হাইয়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ নেন টিপু সুলতান। তিনি আব্দুল হাইকে চাচা এবং তাঁর স্ত্রীকে চাচি বলে সম্বোধন করতেন। ধীরে ধীরে টিপু ব্যবসায় দক্ষতা অর্জন করেন। আব্দুল হাইও তাঁকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে আব্দুল হাই ব্যবসার কাজে বাইরে যেতে শুরু করেন।

ভালো সম্পর্কের কারণে আব্দুল হাইয়ের বাড়িতেও যাতায়াত ছিল টিপুর। একপর্যায়ে আব্দুল হাইয়ের স্ত্রী রেহানা পারভীনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। রেহানা পারভীনের নামে ছিল হাইয়ের বাড়ি ও সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ। তখন হাই-রেহানা দম্পতির সংসারে তিনটি কন্যাসন্তান। রেহানা নিজের নাম পরিবর্তন করে সোহেলী পারভীন নামে টিপু সুলতানকে বিয়ে করেন। ঘটনাটি অনেক দিন গোপন ছিল। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আব্দুল হাই ও রেহানার মধ্যে বিবাদ তৈরি হয়। ২০০১ সালে টিপু-সোহেলী (রেহানা) মিলে আব্দুল হাইকে বিষ প্রয়োগ করেন। এর পর থেকে তাঁর শারীরিক ও মানসিকভাবে অস্বাভাবিক হয়ে যান। তখন হাইকে পাগল বলে গুণ্ডা লেলিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন টিপু ও রেহানা।

আব্দুল হাই এক আত্মীয়ের সহায়তা ও তত্ত্বাবধানে থেকে আবারও সুস্থ-স্বাভাবিক হন। এর পর থেকে তিনি গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে বসবাস করতে শুরু করেন। আর অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে আদালতে চারটি মামলা করেন। আসামি করেন রেহানা পারভীন ও টিপু সুলতানকে। দীর্ঘদিন মামলা চলে। ২০০৯ সালের ১৭ মে খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক ইদ্রিস এম সিদ্দিকী একটি মামলার রায় দেন। ওই রায়ে রেহেনা পারভীনের তিন বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো তিন মাসের কারাদণ্ড হয়। তবে টিপু সুলতান খালাস পান। এ মামলায় রেহানা কিছুদিন কারাভোগ করেন। আপিল পর্যায়ে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে যান। পরে নানা কারণে এ মামলা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন আব্দুল হাই। অন্য তিনটি মামলায় টিপু ও রেহানা খালাস পেয়ে যান।

কিন্তু এর আগেই ২০০১ সালের দিকে টিপু সুলতান ঢাকায় ব্যবসা ফাঁদেন। সখ্য গড়ে তোলেন তখনকার বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও দলটির কোনো কোনো নেতার সঙ্গে। তাঁর সম্পর্ক হয় হাওয়া ভবনের সঙ্গেও। এ সুযোগেই তিনি ব্যাংকঋণ নিতে শুরু করেন। ওই সময়ই চিনি আমদানির নামে জনতা ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে টিপু সুলতান ৩২১ কোটি টাকা ঋণ নেন, যা অন্য খাতে সরিয়ে ফেলেন এবং ব্যাংকঋণও আর পরিশোধ করেননি। এ ঋণের ঘটনাটি দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে। গত ৩১ মার্চ খুলনায় তাঁকে গ্রেপ্তারও করে।

খুলনার ব্যবসায়ী মহলের কেউ কেউ জানান, চটকদারিত্ব এবং বোল পাল্টানোয় খুবই দক্ষ টিপু সুলতান আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে পাট মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে মাত্র ২২ কোটি টাকায় টিপু সুলতান দৌলতপুরের রেলি ব্রাদার্স কিনে নেন। পরে এর নামকরণ করে ঢাকা ট্রেডিং হাউস। এ প্রতিষ্ঠানের জমি দৌলতপুর রূপালী ব্যাংকে বন্ধক রেখে তিনি ৫২ কোটি টাকা ঋণ নেন। তখন ব্যাংকে এই সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয় ১১০ কোটি টাকা। এরপর অবকাঠামো নির্মাণ আর গুদামের পাট দেখিয়ে প্লেজ ঋণ মিলে এই ব্যাংকে তাঁর মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া তিনি আরো কয়েকটি ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর মোট ঋণের সঠিক পরিমাণ জানা যায়নি। ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, টিপু সুলতানের ঋণের পরিমাণ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

টিপুকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলা তদন্তকারী দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ’


মন্তব্য