kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


১০ টাকা কেজির চাল

বিতরণকাজে তদারকি নেই

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



দরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ কর্মসূচিতে তদারকির ব্যবস্থা থাকলেও কার্যত তা কাজে আসছে না। তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এই দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করছেন।

তাঁরা বলছেন, এই বাড়তি দায়িত্ব পালন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। কেউ কেউ মনে করছেন, দাঁড়িয়ে থেকে চাল বিক্রি তদারকি করাটা অসম্মানজনকও। এ অবস্থায় চাল বিতরণে কারচুপি বা অনিয়ম রোধ করা যাচ্ছে না।

নির্দেশনা অনুযায়ী একজন তদারকি কর্মকর্তা প্রতি শুক্র, শনি ও মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ডিলারের দোকানে উপস্থিত থেকে চাল বিতরণ পর্যবেক্ষণ করবেন। সকাল ৯টার মধ্যে উপস্থিত হয়ে তদারকি কর্মকর্তা ডিও পরীক্ষা করে বস্তা ও মালামাল বুঝে নিয়ে বিক্রির অনুমতি দেবেন এবং রেজিস্টারে স্বাক্ষর করবেন। আবার দিনের বিক্রি শেষে উত্তোলন, বিক্রি ও সমাপ্তি মজুদের হিসাব পরীক্ষা করে রেজিস্টারে স্বাক্ষর করবেন। এখানেই শেষ নয়। তিনি ডিলারের চাহিদাপত্রে প্রতিস্বাক্ষর করবেন এবং মালামাল শেষ হলে পুনঃচাহিদার সুপারিশ করবেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার অধিকাংশ ডিলার চাল বিক্রি করেছেন। কিন্তু দু-একজন ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদারকি কর্মকর্তারা ডিলারের দোকানে উপস্থিত ছিলেন না। সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এই প্রতিবেদক যোগাযোগ করেন বিভিন্ন ডিলার ও সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তার সঙ্গে।

হাটিপাড়া ইউনিয়নের বরুণ্ডী বাজারের ডিলার শরিফুল ইসলাম। তদারকি কর্মকর্তা হচ্ছেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নাজিম উর রউফ খান। সকাল ১০টায় যোগাযোগ করা হলে চাল বিক্রি চলছে জানিয়ে ডিলার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘তদারকি কর্মকর্তা সাধারণত আসেন না। বদলে তিনি অন্য একজনকে পাঠিয়ে দেন। তবে কাগজপত্র তদারকি কর্মকর্তাই স্বাক্ষর করেন। ’ নাজিম উর রউফ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অনুপস্থিতির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘অফিসে নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পর এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। আর একজন বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে চাল বিক্রি তদারকি করতে ভালো লাগে না। তাই এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছি। ’

বেতিলা-মিতরা ইউনিয়নের ডিলার কাজী মফিজুল ইসলাম মফেল গতকালও চাল বিক্রি করেছেন। কিন্তু তদারকি কর্মকর্তা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মনোয়ারুজ্জামান দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানে উপস্থিত হননি। যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তাঁর বদলে তাঁরই এক কর্মকর্তা মোতালেব মোস্তফাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। মোতালেব মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমাকে কিস্তি তুলতে হয়। টার্গেট কিস্তি তুলতে না পারলে মাসের বেতন হবে না। তাই চাল বিক্রি তদারকি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ’

একই ইউনিয়নের আরেক ডিলার আমজাদ হোসেন খান এবং তদারকি কর্মকর্তা ওই ইউনিয়ন পরিষদের সচিব পিয়ার আলী। তিনি বলেন, ‘এটা খুবই ঝামেলার কাজ। তাই সেখানে যাই না। তা ছাড়া গত ৫ তারিখে আমি অন্য একটি ইউনিয়নে বদলি হয়ে গেছি। ’

ভাড়ারিয়া ইউনিয়নের ডিলার আবদুর রহমান গতকালও চাল বিক্রি করেছেন বলে জানান। কিন্তু তদারকি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। এই ডিলার বলেন, ‘তদারকি কর্মকর্তা না এলেও অসুবিধা নেই। কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে দেন। ’ তদারকি কর্মকর্তা ভাড়ারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পরিষদের কাজ শেষে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। তাই অব্যাহতিপত্র পাঠিয়েছি। ’

দীঘি ইউনিয়নের তরা বাজারের ডিলার আওলাদ হোসেন মোল্লা গতকাল চাল বিক্রি করলেও তদারকি কর্মকর্তা মুলজান উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. সলিম উদ্দিন উপস্থিত হননি। যোগাযোগ করা হলে তিনিও স্কুলের কাজ করে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয় বলে জানান।

প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য কর্মকর্তারা। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ২০ জন ডিলার। দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারকি কর্মকর্তাও ২০ জন। এঁদের মধ্যে পাঁচজন শিক্ষক, পাঁচজন ইউনিয়ন পরিষদসচিব ও ১০ জন বিভিন্ন বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এঁদের কয়েকজন বলেন, ‘সরকারি দলের নেতাকর্মীরাই মূলত এই কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত। ফলে আমাদের অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করতে হয়। ’ নিজেদের সাক্ষীগোপালের সঙ্গে তুলনা করে তাঁরা বলেন, ‘এমন দায়িত্ব খুব একটা সুখকর নয়। ’


মন্তব্য