kalerkantho


নৃত্যগীতে শরৎবন্দনা

নওশাদ জামিল   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নৃত্যগীতে শরৎবন্দনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় গতকাল শরৎ উৎসবের আয়োজন করে ছায়ানট। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রকৃতিজুড়ে এখন শরতের শান্তি। এ সময় কোমল প্রকৃতি থাকে স্নিগ্ধতার বৈচিত্র্যে ভরা। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি ঝরলেও আকাশ থাকে নীল, নির্মল। পেঁজা তুলোর মতো ভেসে বেড়ায় মেঘের দল। শরতের এ সময়টায় ঢাকের বাদ্যির তালে তালে চলছে দুর্গাপূর্জার উৎসব। সকালে গতকাল শুক্রবার আরেক উৎসবের আয়োজন করেছিল ছায়ানট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় ছায়ানট রবীন্দ্রনাথের গানে গানে উদ্‌যাপন করল শরৎ ঋতুকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান দিয়ে মেঘাচ্ছন্ন সকালে শুরু হয় শরত্বন্দনা। ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৭টায়। এ সময় সমবেত কণ্ঠে গীত হয় ‘বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে’। এ গানের মধ্য দিয়েই সূচনা হয় উৎসবের। এতে পরিবেশিত হয় ছয়টি সম্মেলক গান, ১২টি একক গান ও একটি দ্বৈত গান। তিনটি সম্মেলক গানের সঙ্গে ছিল সম্মেলক নৃত্য। নৃত্যগীতে বন্দনা করা হয় শরতের।

নাগরিক জীবনে কখন কোন ঋতু এলো, কখন বাংলা কোন মাস চলে গেল তার খবর হয়তো অনেকেই রাখে না। চলতি বছরের শরত্কাল এসেছে আরো অনেক আগেই। কিন্তু তা হয়তো কেউ টের পেয়েছে, কেউ পায়নি। এখন চলছে আশ্বিন মাস। নগরবাসীকে শরতের স্নিগ্ধতার জানান দিতেই ছায়ানট আয়োজন করে এ উৎসবের।

আয়োজন শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল ৭টায়। তারও আগে থেকে উৎসবস্থলে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। সবারই সুন্দর পরিপাটি পোশাক। প্রাণোচ্ছল তরুণীরা যথারীতি শাড়ি-ফুলে সেজে আসেন। কারো মেঘকালো আঁচল। কারো জমিনে আকাশের নীল। খোঁপায় ফুলের মালা। তরুণদের ছিল পাঞ্জাবি-সাজ। সেখানে সাদা মেঘের ভেলা।

চারুকলার সবুজ চত্বরের পুরোটাজুড়ে ছিল অনুষ্ঠান। উৎসবস্থলে উঁকি দিচ্ছিল কৃত্রিমভাবে লাগানো কাশগুচ্ছ। পরিপাটি করে সাজানো মঞ্চে উঠে বসেছিলেন শিল্পীরা। একেবারে পেছনের অংশে সংগীতশিল্পী। তাঁদের সামনে হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি, মন্দিরা ইত্যাদি নিয়ে একদল যন্ত্রসংগীত শিল্পী। তখনই গানে গানে বেজে ওঠে শরতের ঢাক। একক ও সম্মেলক গান এবং নৃত্যের মধ্য দিয়ে চলে ছায়ানটের শিল্পীদের সুরে সুরে শরৎ-অঞ্জলি।

শরৎ উৎসবের এই আয়োজনে কোনো বক্তৃতা ছিল না। শিল্পীরা পর্যায়ক্রমে সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন। সাত-সকালে বের হওয়া নানা বয়সী মানুষ অনুষ্ঠান উপভোগ করে। ফলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নৃত্যগীতে মুখর ছিল গোটা আয়োজন।

উদ্বোধনী গান ছাড়াও সম্মেলক কণ্ঠে শিল্পীরা গেয়ে শোনান ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি’ ও ‘আমার নয়ন-ভুলানো এলে’। আর ‘ওগো শেফালিবনের’, ‘আনন্দেরই সাগর হতে’ ও ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র-ছায়ার’—সম্মেলক কণ্ঠে এই তিন গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা। কৌশিক সাহা ও মন্দ্রিতা বিশ্বাস দ্বৈত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে’। এ ছাড়া বেশ কজন শিল্পী একক কণ্ঠে গেয়ে শোনান গান। মাকসুরা আখতার গেয়ে শোনান ‘অমল ধবল পালে লেগেছে’, রাইয়ান বিনতে হাবীব ‘আমারে ডাক দিল কে’, দীপাঞ্জন মুখার্জী ‘হৃদয়ে ছিলে জেগে’, সুতপা সাহা ‘কোন্ খেলা যে খেলব কখন’, সুদীপ সরকার ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’, শ্রাবন্তী শোভনা ‘তোমরা যা বল তাই বলো’, সৈকত মুখার্জী ‘কেন আমায় পাগল করে যাস’, সেমন্তি মঞ্জরী ‘কোন্ খেপা শ্রাবণ’, মানস ভট্টাচার্য ‘আমার রাত পোহালো’, সেঁজুতি বড়ুয়া ‘মেঘ কেটে গেছে’ গেয়ে শোনান।

উৎসবের শেষে সবাই দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে। বাংলার ঐতিহ্য মুড়ি-মুড়কি বিতরণের মধ্য দিয়ে ছায়ানটের শরৎ উৎসব শেষ হয়।


মন্তব্য