kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বন্দরে পণ্য খালাসে বাড়তি ব্যয়

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বন্দরে পণ্য খালাসে বাড়তি ব্যয়

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ছোট জাহাজ সংকটের কারণে পণ্য নামাতে অনেক বেশি সময় লাগছে। আর বাড়তি সময় সাগরে অলস বসে থাকার ব্যয় যোগ হচ্ছে আমদানি পণ্যে।

এতে বাড়ছে পণ্যের দাম, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ঘাড়ে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে পণ্য আমদানি বাড়ার গতির সঙ্গে মিল রেখে নতুন লাইটার বা ছোট জাহাজ তৈরি হচ্ছে না। বর্তমান জাহাজ মালিকরা চাইছেন বর্তমানে থাকা ৭০০ ছোট জাহাজ দিয়েই সব পণ্য পরিবহন করতে। এ জন্য তারা কৌশলে চাপ সৃষ্টি করে নতুন জাহাজ তৈরির সরকারি অনুমোদন বন্ধ করে রেখেছে বেশ কয়েক বছর ধরে।

আমদানিকারকরা বলছেন, অবকাঠামো উন্নয়নে যে গতি এসেছে তাতে বর্তমানের দ্বিগুণসংখ্যক ছোট জাহাজ দরকার। এখনই সিদ্ধান্ত না হলে পরবর্তী সময়ে বিপর্যয়ে পড়তে হবে। আর নতুন জাহাজ তৈরি না হওয়ায় বিদেশি জাহাজগুলোকে সময় নষ্ট হওয়ার জরিমানা পরিশোধ করতে গিয়ে বিপুল টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। ভোক্তা পর্যায়ে বেড়ে যাচ্ছে আমদানি পণ্যের দামও।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান এ কে এম সামশুজ্জামান রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে প্রতিদিন পণ্য নামানোর কথা চার হাজার টন। কিন্তু লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টন পণ্য খালাস সম্ভব হচ্ছে। ইতিমধ্যে ইটভাটার জন্য আগেভাগেই কয়লা আসা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিদেশ থেকে পাথর আসছে। আসা শুরু হয়েছে বিপুল পরিমাণ সার। ফলে এখনই পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আগামী দিনে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। ’

জানা গেছে, ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে ‘পোর্ট মেকাউ জাহাজ’ গত ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। এর মধ্যে ৩৩ হাজার টন কয়লা চট্টগ্রাম বন্দরে ও বাকিটা মংলা বন্দরে নামানোর কথা রয়েছে। ছোট জাহাজ বরাদ্দ না পাওয়ায় বিগত ১৩ দিনে ৩৩ হাজার টনের মধ্যে পণ্য নামানো সম্ভব হয়েছে মাত্র সাড়ে ২০ হাজার টন। ছোট জাহাজ সংকটে এমন সমস্যায় আড়ে আছে সাগরে অন্তত ৭০টি জাহাজে থাকা পণ্যের আমদানিকারকদের।

উদ্বেগ প্রকাশ করে ‘পোর্ট মেকাউ জাহাজ’ জাহাজের শিপিং এজেন্ট সামুনদা শিপিং লাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাহাজ পেলে চার দিনে ৩৩ হাজার টনের পুরোটাই নামাতে পারতাম। দু-তিন দিন পর একটি জাহাজ বুকিং পাচ্ছি। ফলে বাকি পণ্য কখন নামাবো তার ঠিক নেই। অথচ বিলম্বের জন্য জাহাজকে প্রতিদিন ১২ হাজার ডলার করে জরিমানা গুনতে হচ্ছে। আট দিনে ৭৬ লাখ টাকা দিতে হবে। ফলে এক জাহাজে এত টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তো আমদানিকারক পথে বসবে। আমার মতো সবারই একই অবস্থা। ’ জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বছরে দেড় কোটি টন আমদানি পণ্য বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে করে নামানো হয়। বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে নামিয়ে চট্টগ্রামের ১৬টি ঘাটে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এসব পণ্য নামানোর জন্য প্রয়োজনীয় লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেয় ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল। এই সেল প্রতিদিন বিকেলে বসে জাহাজ বুকিং দিয়ে থাকে। কিন্তু গত ১০ দিনে মাত্র তিন দিন মিটিং বসলেও জাহাজ খালি না থাকায় বৈঠকই বসেনি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম লাইটার জাহাজ ঠিকাদার সমিতির সভাপতি হাজি শফিক আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে হারে পণ্য আমদানি হচ্ছে সে অনুযায়ী ছোট জাহাজ খালি পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু আমদানিকারক এসব জাহাজকে পণ্যের ভাসমান গুদাম বানিয়ে রেখেছেন। তারা মাসের পর মাস জাহাজ খালি না করায় সাগরে পণ্য নামাতে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন আমদানিকারকরা জাহাজের জন্য হৈ চৈ করছেন কিন্তু আমরা বরাদ্দ দিতে পারছি না। এতে ব্যবসায়ীদের তা বারোটা বেজে যাচ্ছে। ’ অভিযোগ পাওয়া গেছে, বর্তমানে থাকা ৭০০ ছোট জাহাজের মালিকরা পুরো পরিবহন ব্যবসা কবজা করে রাখতে চাইছেন। এ জন্য নতুন জাহাজ তৈরির অনুমোদন তাঁরা চাপ প্রয়োগ করে বন্ধ রেখেছেন।

চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির আকার অনেক বড় হয়েছে। বড় অবকাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রচুর পণ্য আমদানি হচ্ছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাহাজ তৈরি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু কারা কিসের স্বার্থে জাহাজ তৈরি বন্ধ রেখেছে তা খতিয়ে দেখা উচিত। ’


মন্তব্য