kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হোসেনী দালানে বোমা হামলা

চার্জশিট দেওয়ার ৬ মাস পরও শুরু হয়নি বিচার

এস এম আজাদ   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পবিত্র আশুরার তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে গত বছর মধ্যরাতে পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে বোমা হামলা চালিয়েছিল জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিরা। এতে দুজন নিহত ও ১০০ জনের বেশি আহত হয়েছিল।

সেই মামলায় ১৩ জঙ্গিকে অভিযুক্ত করে গত ছয় মাস আগে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি); কিন্তু এখনো বিচার শুরু হয়নি।

এবার আগামী ১২ অক্টোবর পবিত্র আশুরা। গতবারের সেই ভয়াবহ স্মৃতি মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বলছে, গতবারের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে এবার তারা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছে। হোসেনী দালান এলাকা, কারবালা বা তাজিয়া মিছিলে কেউই তল্লাশি ও নজরদারির বাইরে থাকবে না।

 

ডিবি সূত্র জানিয়েছে, হামলায় অংশ নেওয়া নব্য জেএমবির দলটিতে ছিল ১৩ জঙ্গি। সংগঠনটির সামরিক শাখার কমান্ডার শাহাদাৎ ওরফে আলবানি ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা ছিলেন হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী। এই পরিকল্পনাকারীসহ তিনজন ইতিমধ্যে ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে অপর ১০ জনকে, যাদের চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

ডিবি জানায়, শিয়া সম্প্রদায়ের বড় সমাবেশস্থলে বেশিসংখ্যক মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল ওই জঙ্গিদের। তবে সিসিটিভি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে স্থাপনসহ নিরাপত্তার কিছু উদ্যোগের কারণে জঙ্গিরা পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, পবিত্র আশুরা উদ্‌যাপন ও তাজিয়া মিছিল উপলক্ষে গত রবিবার ডিএমপির হেডকোয়ার্টার্সে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভা শেষে ডিএমপির কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া একটি আদেশ জারি করেন। ওই আদেশে তাজিয়া মিছিলে ছুরি, বল্লম, দা ও তলোয়ারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ডিএমপির কমিশনার বলেন, হোসেনী দালান, কারবালা, বিবি-কারওজাসহ রাজধানীর যেখানে যেখানে আশুরার অনুষ্ঠান হয়, সেখানে সেখানে সিসিটিভি স্থাপন করতে হবে, প্রবেশমুখে আর্চওয়ে স্থাপন করে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে হ্যান্ডমেটাল ডিটেক্টর দিয়ে চেক করে সবাইকে প্রবেশ করাতে হবে। কোনোক্রমেই কাউকে ব্যাগ, টিফিন বক্স, প্রেশার কুকার নিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। পাইকরা দৌড়ে সরাসরি অনুষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং ছুরি, বল্লম, দা ও তলোয়ার নিয়ে মিছিল করতে পারবে না। হোসেনী দালান থেকে বের হওয়া মিছিলটিতে অতীতে দা, কাঁচি, ছুরি, বল্লম ও শিকল দিয়ে বেঁধে বের হতো পাইকরা।

ডিএমপির কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, নিরাপত্তার জন্য কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। নিরাপত্তার স্বার্থে রাজধানীর জন্য নির্ধারিত রুটে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাজিয়া মিছিল শেষ করতে হবে। এক এলাকার মিছিল নিয়ে অন্য এলাকায় যাওয়া যাবে না। মিছিলে নিশান, পাঞ্জা ব্যবহারের জন্য ১২ ফুটের বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট কোনো লাঠি বা বাঁশ ব্যবহার করা যাবে না। কোনো প্রকার আতশবাজি ও পটকা ফোটানো যাবে না। তিনি আরো বলেন, প্রতিটি মিছিলে ও অনুষ্ঠানে অবশ্যই পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করতে হবে এবং প্রত্যেককে আর্মব্যান্ড বা কটি বা জ্যাকেট দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে, যাতে সহজেই তাদের চেনা যায়। তারা মিছিলে বহিরাগতদের চিহ্নিত করে তাদের অনুপ্রবেশ বন্ধে কাজ করবে।

ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, গত বছরও ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল। এর কিছু দুর্বলতা ছিল। সব স্থানে তল্লাশি ও সিসিটিভি ছিল না। এই সুযোগ নিয়েছে জঙ্গিরা। এবার কেউই তল্লাশির বাইরে থাকতে পারবে না। থাকবে ব্যাপক গোয়েন্দা তত্পরতা।

জানতে চাইলে ডিবির উপকমিশনার (ডিসি-দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতবারের বোমা হামলায় ১৩ জঙ্গি জড়িত ছিল। তাদের শনাক্ত করে আমরা ১০ জনকে গ্রেপ্তার করি। অভিযানের সময় তিনজন মারা যায়। গ্রেপ্তারকৃতদের জবানবন্দিতে ঘটনার ব্যাপারে পুরো জানা গেছে। গত ২০ এপ্রিল আমরা চার্জশিট জমা দিয়েছি। এখন মামলাটি বিজ্ঞ আদালতে বিচারের অপেক্ষায় আছে। ’

চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলো শাহাদাৎ ওরফে আলবানি ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা, আব্দুল বাকি ওরফে আলাউদ্দিন ওরফে নোমান, সাঈদ ওরফে হিরন ওরফে কামাল, জাহিদ হাসান ওরফে রানা ওরফে মোসায়েব, আরমান, রুবেল ইসলাম ওরফে সজীব, কবির হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আশিক, মাসুদ রানা, আহসান উল্লাহ মাহমুদ, আবু সাইদ সোলায়মান ওরফে সালমান, শাহজালাল, ওমর ফারুক ওরফে মানিক ও চান মিয়া।

সূত্র জানায়, গত বছরের ২৫ নভেম্বর গাবতলীতে ডিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় মাহফুজ ওরফে হোজ্জা। গত ১৩ জানুয়ারি রাতে হাজারীবাগে ডিবির সঙ্গে আরেক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় জেএমবির দুই ‘কমান্ডার’ হিরন ওরফে কামাল ও আলাউদ্দিন ওরফে নোমান। তারা তিনজনই হোসেনী দালানে বোমা হামলা, গাবতলী ও আশুলিয়ায় পুলিশ সদস্য হত্যায় জড়িত। এ ছাড়া গত বছরের ২১ এপ্রিল আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজারে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডাকাতি ও আটজনকে হত্যার ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিল হোজ্জা।

গ্রেপ্তারের পর কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জাহিদ হাসান ওরফে রানা ওরফে মোসায়েব গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ২৮ জানুয়ারি জবানবন্দি দেয় আরমান। এর আগে রুবেল ইসলাম ওরফে সজীব ও কবির হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আশিক আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। জবানবন্দিতে তারা জানায়, মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পেও শিয়াদের ওপর হামলার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এ জন্য প্রথম তারা মোহাম্মদপুরে বাসা ভাড়া নিয়েছিল। পরে হোসেনী দালানে হামলার পরিকল্পনা করে তড়িঘড়ি করে কামাঙ্গীরচরে বাসা ভাড়া নেয়। হোসেনী দালানের কবরস্থান থেকে মাহফুজ ওরফে আলবানি পাঁচটি গ্রেনেড বোমা ছুরে মারে। এ সময় তার সঙ্গে রাশেদ ওরফে আশিক উপস্থিত ছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল হামলার দৃশ্য ভিডিও করার। কিন্তু আলোস্বল্পতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির পর পীর ও মাজারের অনুসারীদের হত্যায়ও অংশ নিয়েছিল এসব জঙ্গি।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৩ অক্টোবর রাত পৌনে ২টার দিকে হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে হ্যান্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। পরে মামলাটির তদন্তভার ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়।


মন্তব্য