kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সরেজমিন পবা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র

ভয়ংকর চিকিৎসা, নির্দয় সেবা

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বুধবার সকাল ১১টা। রাজশাহীর পবা উপজেলার দারুশা এলাকায় অবস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জরুরি বিভাগে চিত্কার করে কান্নাকাটি করছিল বছরতিনেকের একটি শিশু।

তাকে চেপে ধরে রেখেছে দুজন লোক। অন্য একজন শিশুটির ঠোঁটের কেটে যাওয়া অংশ সেলাই করছেন। প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলল এই চিকিৎসা।

জানা গেল, চিকিৎসা দেওয়া এই লোকটি চিকিৎসক নন, তিনি হাসপাতালের উপসহকারী কমিউনিটি অফিসার (সেকমো) তারিকুজ্জামান। জরুরি বিভাগে চিকিৎসক না থাকায় তিনি  একজন এমএলএসএস (অফিস সহকারী) এবং শিশুটির বাবার সহযোগিতায় তার ঠোঁটে দুটি সেলাই দেন। অথচ এই উপসহকারী কমিউনিটি অফিসারের দায়িত্ব হলো শুধু ভর্তি হওয়া রোগীদের নাম-ঠিকানা, বয়সসহ আনুষঙ্গিক তথ্য লিপিবদ্ধ করা। কিন্তু এসব কাজ করার পাশাপাশি শিশুদের চিকিৎসা দেওয়াসহ অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদেরও চিকিৎসা দিতে দেখা যায় তাঁকে।

শিশু রোগীকে সেলাইয়ের মতো চিকিৎসা তিনি দিতে পারেন কি না—জানতে চাইলে তারিকুজ্জামান বলেন, ‘ম্যাটসে পড়ার সময় ছোটখাটো সেলাই ও কাটাকুটি সম্পর্কে তো প্রশিক্ষণ নিয়েছি। ওই অভিজ্ঞতা দিয়েই চিকিৎসা দিচ্ছি। ’

তারিকুজ্জামান যে শিশুটিকে চিকিৎসা দিলেন তার নাম রহিদুল। সে পবার নওহাটা পৌর এলাকার ইটাখাটি গ্রামের বোরহান উদ্দিনের ছেলে।

বোরহান কালের কণ্ঠকে জানান, গতকাল সকালে তাঁর ছেলে খেলতে গিয়ে পড়ে ঠোঁট কেটে যায়। এরপর অনেক রক্তপাত হওয়ায় ছেলেকে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসেন। নওহাটা থেকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। সেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায়। কিন্তু শহরের হাসপাতালে নিয়ে গেলে বেশি খরচ হবে ভেবে নিম্ন আয়ের বোরহান ছেলেকে নিয়ে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে পবা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছেন।

শুধু জরুরি বিভাগেই এমন চিত্র নয়, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের আরো অনেক কিছুই দেখা গেছে এই উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।

হাসপাতালের দায়িত্ব বণ্টনের তালিকায় দেখা গেছে, গতকাল ১১ জন চিকিৎসকের থাকার কথা। কিন্তু ছিলেন সাতজন। অনুপস্থিত ছিলেন গাইনি বিশেষজ্ঞ হুমাইরা শাহরিন, মেডিক্যাল অফিসার আফসানা রহমান, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) বার্নাবাস হাসদা ও আরো একজন মেডিক্যাল অফিসার।

চিকিৎসক না থাকায় জরুরি বিভাগের রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন হাসপাতালের উপসহকারী কমিউনিটি অফিসার (সেকমো) তারিকুজ্জামান। তাঁকে অন্তত ১০ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে।

কর্ণহার গ্রাম থেকে আসা রোগী আজিজা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জ্বর-সর্দির চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসিছি। কিন্তু যে ঘরে য্যাতে বলল, সেখানে য্যায়ে দেখি ডাক্তার নাই। তাই আবার এখানে অ্যাসেছি। ’ তাঁকে চিকিৎসা দিয়েছেন তারিকুজ্জামান।

তবে আধাঘণ্টা পর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জরুরি বিভাগে মেডিক্যাল অফিসার আমেনা পারভীনকে পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে এই চিকিৎসক বলেন, ‘আমার জরুরি বিভাগের দায়িত্ব আজ নাই। তবে যাঁর দায়িত্ব আছে, তিনি না থাকায় আমিই বসেছি। ’

এই বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা কবিরাজপাড়া এলাকার ফরিদা বেগম বলেন, ‘দুপুর ১২টা বাজলেই হাসপাতালে আর কোনো চিকিৎসক থাকে না। এমনিতেও তেমন চিকিৎসক থাকে না। আর দুপুর হলে সব ফাঁকা হয়ে যায়। তাই আগেভাগে এসেই ডাক্তার দেখাতে হয়। তাও একজনের কাছেই অনেকক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকতে হয়। এরপর কোনোমতে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি যাই। ওষুধ তো দেয় না। ’

এরপর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসা ও সেবা বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে ধরা পড়ল আরো নানা অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র।

পুরুষ ওয়ার্ডে পাওয়া গেল সাতজন রোগীকে। তাদের মধ্যে মসলেম উদ্দিন (৭০) নামের একজন বলেন, ‘এখানে ওষুধ দেয় না। দুই-একটা বড়ি দেয়, আর বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে অ্যানতে হয়। সকালে একবার ডাক্তার অ্যাসি দেখি যায়, এরপর আর কোনো খোঁজও থাকে না। ’

আরেক রোগী সাইদুর রহমান (৬০) চার দিন আগে ভর্তি হয়েছেন শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতা নিয়ে। তিনি জানান, এই চার দিনে দুই-একটা করে বড়ি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকি ওষুধগুলো বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়েছে।

হাসপাতালের ওষুধ বণ্টনের তালিকায় দেখা গেছে, সাইদুর রহমানকে প্যারাসিটামল, রেনিডিন, স্যালবিউটামল ও এজিথ্রোমাইসিন দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালের নারী ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১৩। কেউ বিছানায় শুয়ে আছে, কেউ বসে থেকে গল্প করছিল।

তাদের মধ্যে গত শনিবার ভর্তি হয়েছেন সাজেদা বেগম। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে ওষুধ দেয় না। আবার খাবারও খাওয়া যায় না। এই কদিন একবারের জন্যেও মাংস আর দুধ চোখে দেখিনি। অথচ রাজশাহী শহরের হাসপাতালে এসব দেওয়া হয়। ’ ‘তাহলে আমাদের হাসপাতালে দেওয়া হয় না কেন?’ প্রশ্ন করেন সাজেদা। পরে তিনি নিজেই এর উত্তর দেন, ‘আমাদের গরিবদের হাসপাতাল, তাই আমরা পাই না। ’

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রোগীদের খাবার দিতে আসেন হাসপাতালের একজন কর্মচারী। খাবারের ট্রলিতে রাখা একটি বড় হাঁড়িতে মোটা চালের ভাত, আরেকটি হাঁড়িতে সিলভার কার্প মাছ, আরেকটিতে আলুর ঘাটি এবং অন্য একটি পাত্রে পাতলা পানির মতো দেখতে ডাল। খাবারের ট্রলিতেই ঝোলানো রোগীদের খাদ্যতালিকায় লেখা আছে ২৮ জনের নাম। কিন্তু ৩১ শয্যার এ হাসপাতালটির দুটি ওয়ার্ডে রোগী আছে ২০ জন। এর মধ্যে দুজন রোগী আছে, যারা গতকাল সকালে ভর্তি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তারা এক দিন পর থেকে হাসপাতালের খাবার পাবে। সেই হিসাবে খাবার পাওয়ার কথা ১৮ জনের।

তালিকায় ২৮ জন রোগী কেন জানতে চাইলে ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবিকা মাহমুদা বেগমের জবাব, ‘কয়েকজন রোগী ছুটি নিয়ে চলে গেছে। আবার কয়েকজন নতুন ভর্তি হয়েছে। তাদের সবাই খাবার পাবে। ’ ছুটি নিয়ে চলে যাওয়া রোগীরা কিভাবে খাবার নিতে আসবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা খাবার খেয়ে চলে যাবে। তাহলে ওই রোগীগুলো কোথায় জানতে চাইলে এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি মাহমুদা।

দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবিকা গতকাল হাসপাতালের অফিস সহকারীকে রোগীর যে তালিকা দিয়েছেন সেখানে ৩১ জন উল্লেখ ছিল।

তবে হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেজাউল হক চৌধুরী দাবি করেন, গতকাল হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল ২৯ জন।

হাসপাতালের খাবার বিতরণের তালিকায় দেখা যায়, গতকাল রোগীদের জন্য পাঁচ কেজি মুরগির মাংস বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে যেসব রোগী চিকিৎসাধীন, তারা কেউ বলতে পারেনি এর মধ্যে মাংস বিতরণ করা হয়েছে কবে। যে খাবার দেওয়া হয় সেগুলো খাওয়ার অযোগ্য বলে জানায় রোগীরা। খাদ্যতালিকায় প্রায় প্রতিদিনই সিলভার কার্পজাতীয় মাছ থাকে।

খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদার হারুন-অর-রশিদ হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘ম্যানেজ’ করে ইচ্ছামতো খাদ্য সরবরাহ করেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ঠিকাদার হারুন-অর-রশিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসক না হয়েও একজন উপসহকারী কমিউনিটি অফিসার রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছেন কিভাবে জানতে চাওয়া হয়েছিল হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেজাউল হক চৌধুরীর কাছে। তিনি গতকাল হাসপাতালে ছিলেন না। ফোনে তিনি বলেন, ‘ওই ব্যক্তির চিকিৎসা দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নাই। এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে রেজাউল হক চৌধুরী বলেন, ‘এরই মধ্যে নিয়মিত হাসপাতালে না আসার কারণে কয়েকজন চিকিৎসককে আমি শোকজও করেছি। কিন্তু তার পরও যদি এ রকম হয়ে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

রোগীদের খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে যে অনিয়ম দেখা গেছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে রেজাউল হক চৌধুরী সাক্ষাতে কথা বলার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমি অফিসের কাজেই হরিয়ান এলাকায় আছি। ’ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেজাউল হক জানান, হাসপাতালের এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ২০০৪ সালে নতুন এক্স-রে মেশিন পাওয়া গেলেও অন্যান্য সুবিধা না পাওয়ায় সেটিও এখন নষ্ট হতে বসেছে। অস্ত্রোপচার কক্ষও দীর্ঘদিন ধরে বলতে গেলে ব্যবহার হয় না। শুধু বন্ধ্যাকরণের চিকিৎসা দেওয়া হয়।


মন্তব্য