kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অনিয়ম থামাতে কঠোর হচ্ছে মন্ত্রণালয়

মোশতাক আহমদ   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অনিয়ম থামাতে কঠোর হচ্ছে মন্ত্রণালয়

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু না হতেই শুরু হয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতি। যাদের জন্য এ কর্মসূচি, সেই অতিদরিদ্র লোকজনই ১০ টাকা কেজি দরের চাল পাচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, নীতিমালা লঙ্ঘন করে দুস্থ লোকজনকে বাদ দিয়ে অনেক জায়গায় কার্ড দেওয়া হচ্ছে দলীয় ও সচ্ছল লোকজনকে। স্বজনপ্রীতি চলছে, একজনের নামে একাধিক কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। নীতিমালা লঙ্ঘন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সেই ডিলাররা নিজেরাই তালিকা করছেন। ফলে বাদ পড়ছে অতিদরিদ্ররা। কার্ডের বিনিময়ে দুস্থদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ আদালতেও গড়িয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতি দেখভালের কথা থাকলেও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকরা যথাযথ ভূমিকা রাখছেন না।   

অভিযোগের খবর খাদ্য মন্ত্রণালয়েও পৌঁছেছে। এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনায় এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এ জন্য মাঠপর্যায়ে তালিকা করে দরিদ্রদের কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এসেছে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তর থেকেও এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। অনিয়মের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সরাসরি সাসপেন্ড করা হবে।

অতিদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব নামের এই কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। এর মাধ্যমে ১০ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি চাল পাবে দুস্থ লোকজন। ৬৪ জেলায় প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এ কর্মসূচির সুবিধা পাবে। ক্ষেতখামারে কাজ থাকে না যে সময়টায়, সেই পাঁচ মাস (সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, মার্চ ও এপ্রিল) এ কর্মসূচি চলবে। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবছরে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হবে। গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের চিলমারীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। খাদ্য অধিদপ্তর এ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

সূত্র জানায়, দেশে ওএমএস (খোলাবাজারে খাদ্যপণ্য বিক্রি) কর্মসূচি চলমান থাকলেও অতিদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি চালু আছে ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) ও ভিজিডি (ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট) কর্মসূচি। তবে ভিজিএফ-ভিজিডি কার্ডধারীরা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধা পাবে না।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে ডিলার নিয়োগ-সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, সব উপজেলায় খাদ্য কর্মকর্তার অফিসের নোটিশ বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী যোগ্যতা যাচাই করে ডিলার নিয়োগ দিতে হবে। ৫০০ সুবিধাভোগীর জন্য একজন ডিলার থাকবে। ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় হাট বা বাজারে নির্দিষ্ট দোকান থাকতে হবে। ওই দোকানে একসঙ্গে কমপক্ষে ১৫ টন খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই ব্যক্তি খাদ্য বিভাগের একাধিক ডিলার হতে পারবেন না। সরকারি কর্মচারী বা জনপ্রতিনিধি ডিলার হতে পারবেন না।

দুস্থদের তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, সুবিধাভোগী পরিবারকে ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। নারীপ্রধান (বিধবা/তালাকপ্রাপ্ত/স্বামী পরিত্যক্ত) এবং যে পরিবারে দুস্থ শিশু আছে, সেই পরিবার অগ্রাধিকার পাবে। একই পরিবারে একাধিক ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত করা যাবে না। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাভুক্ত কর্মসূচির সুবিধাপ্রাপ্তরা এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। এ কমিটিই ডিলার নিয়োগ ও অতিদরিদ্র পরিবার বাছাই করবে।

তবে এ নীতিমালা মানা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে। সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হাজিরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মনোয়ারা বেগমকে লাঞ্ছিত করেছেন একই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, তিনি অতিদরিদ্রদের জন্য কার্ড চেয়েও পাননি। চেয়ারম্যান তাঁর পছন্দের লোকদের মধ্যে কার্ড বিতরণ করেছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগম অবশ্য বলেছেন, অতিরিক্ত কার্ড চেয়ে না পেয়ে খলিল তাঁকে লাঞ্ছিত করেন। ঠাকুরগাঁও ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজশাহী, খুলনা ও ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নীতিমালা উপেক্ষা করে। ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা। যশোরের চৌগাছায় ডিলারদের কাছ থেকে ৩০ হাজার করে টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ ডিলারের বাজারে দোকান নেই। কর্মসূচির চাল তাঁরা পাচার করছেন ব্যবসায়ীদের কাছে। ধরা পড়ে জেলেও গেছেন অনেক মৌসুমি ডিলার। বগুড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বরিশালের গৌরনদীতে পাচারকালে চালের ট্রাক আটক করা হয়েছে। চাল বিতরণকে কেন্দ্র করে যশোরের শার্শায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। খুলনায় ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী ও যুবলীগ নেতারা। ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নে উপজেলা যুবলীগ নেতা ও কলেজের প্রভাষকদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অনেকেরই বাজারে দোকান নেই। যশোর, বরিশাল, শরীয়তপুর, বান্দরবান, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায়ও ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তদন্তে অনেক অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় না। কারণ মাঠপর্যায়ে পারস্পরিক শত্রুতার জের ধরেও অনেক অভিযোগ আসে। এর পরও দরিদ্রদের চাল নিয়ে কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।


মন্তব্য