kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভূমিহীন ‘জমিদারদের’ ঠিকানা বেড়িবাঁধে

রফিকুল ইসলাম, পায়রা বন্দর থেকে ফিরে   

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পায়রা নদীবন্দরের ওপারের গ্রাম ধানখালী। সেই গ্রামের সাবেক জনপ্রতিনিধি ইসমাইল হোসেন তালুকদার (৮৫)।

জনপ্রতিনিধি নন, এলাকায় তিনি পরিচিত জমিদার হিসেবে। দুই বছর আগেও ইসমাইলের ‘জমিদারি’ বজায় ছিল। কিন্তু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জমি দিয়ে এখন তিনি ভূমিহীন। তাঁর জমির ওয়ারিশ দাবি করে ১১টি মামলা হওয়ায় তিনি ক্ষতিপূরণের টাকাও পাচ্ছেন না। সে কারণে নিঃস্ব এই মানুষটি পরিবার নিয়ে ঠাঁই নিয়েছেন বেড়িবাঁধের ঝুপড়িতে।

শুধু ইসমাইল নন, তালুকদার পরিবারের তিনজন এখন বলতে গেলে নিঃস্ব। দুজন বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এমন আরো অন্তত ২৫টি পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে বেড়িবাঁধে। তাঁরা বলেছেন, এমন কষ্ট আর অসম্মান তাঁরা সইতে পারছেন না। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই দুর্দশা থেকে রেহাই দেওয়া হোক।

সরেজমিন : পায়রা বন্দরের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে টিয়াখালী নদী। টিয়াখালীর ওপারেই ধানখালী। পূর্বে রাবনাবাদ আর দক্ষিণে আন্ধারমানিক নদী। এই তিন নদীবেষ্টিত এক হাজার দুই একর জমিতেই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠছে। সেই ভূমির তিন দিকেই বেড়িবাঁধ। বাঁধে গড়ে উঠেছে ঝুপড়ি। এসব ঝুপড়িতে আশ্রয় নিয়েছে জমি দিয়ে ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পরিবারগুলো।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর (ঈদুল আজহার দিন) ধানখালী গিয়ে দেখা গেছে, অধিগ্রহণ করা জমি বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। ভূমি থেকে সেই বালুর উচ্চতা প্রায় ১৪ ফুট। এক কোণে ইট-পাথরের সুসজ্জিত দ্বিতল ভবন। সেটিই অফিস ঘর।  

ভবনের দক্ষিণেই টিয়াখালী নদীর তীর রক্ষাবাঁধ। সেই বাঁধে অন্তত ২৫টি পরিবারের লোকজন ঠাঁই নিয়েছে। তাদের মধ্যে ইসমাইল হোসেন তালুকদার অন্তত ৫০ একর জমির মালিক ছিলেন। বছর দুয়েক আগেও সেই জমিতে মণে মণে ধান ফলত, উঁচু জমিতে সারা বছরই সবুজ সবজির সমারোহ ছিল। পুকুরে ছিল মাছ। আগের সেই সব কিছুই এখন অতীত। জমিদার ইসমাইল এখন ভূমিহীন।

‘জমিদার’ পরিবারেরই সদস্য হনুফা বেগম (৫৫)। প্রায় ৯ একর জমির মালিক। পুরোটাই চলে গেছে অধিগ্রহণে। স্বামী শাহ আলমের সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধে। বসতবাড়ির প্রাথমিক ক্ষতিপূরণের টাকায় চলছে তাঁদের সংসার। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা কোনো কাজেই আসছে না। তাঁদের জমি নিয়ে কোনো মামলা না থাকলেও একটি মৌজায় মামলা থাকায় ক্ষতিপূরণ আটকে আছে।

তালুকদার পরিবারের আরেক সদস্য মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন তালুকদার ধানখালী (সাবেক লালুয়া) ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান। তিনিও ছিলেন মধুপাড়া গ্রামের ‘জমিদার’। অথচ এখন তাঁর ১ শতাংশ জমিও নেই। পারিবারিক কবরস্থানও চলে গেছে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অধিগ্রহণে। নিজে আইন পেশার সঙ্গে জড়িত, তবু ক্ষতিপূরণ আটকে আছে মামলা জটিলতায়। ইউনিয়নের নিশানবাড়িয়া, চরনিশানবাড়িয়া আর মধুপাড়া গ্রামের কষ্টের কথা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন প্রচারপত্রে এভাবে—‘সকালবেলা রাঁধি মোরা/ সন্ধ্যার আগে খাই/ ওয়াপদার (বাঁধ) ঢালে শুয়ে থাকি/ সুখের সীমা নাই’।

অধিগ্রহণের ফলে মধুপাড়া গ্রামের তালুকদার পরিবারের সদস্যরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা এক হাজার দুই একর ভূমির মধ্যে মধুপাড়ারই ৭৫৮ একর, যার অধিকাংশই তালুকদার পরিবারের।

বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেওয়া মধুপাড়ার আরেক বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তাঁর দুই একর জমি ছিল। সেই জমির এক কোণে ছিল বসতবাড়ি। কৃষিই ছিল তাঁর জীবিকার অবলম্বন। তাঁর সেই জমি বসতবাড়িসহ অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ আনতে গিয়ে দেখেন মালিকানা দাবি করে স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি মামলা করেছে। এখন এই মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি ক্ষতিপূরণ পাবেন না।

রাজ্জাক দাবি করেন, প্রায় ৭০ বছর আগে তাঁরা পরিবার নিয়ে এই জমি রাখাইন পরিবারটির কাছ থেকে কিনেছিল।

মধুপাড়া ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ফিরোজ তালুকদারের কৃষি জমির সবই অধিগ্রহণ হয়েছে। রাখাইনদের সমাধিস্থলের পাশে থাকায় রক্ষা পেয়েছে তাঁর বসতভিটা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ তুলে মামলা করা হয়েছে। সেই কারণে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি না। ’ আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ইউপি সদস্যের সুপারিশ নিয়ে চেয়ারম্যান ওয়ারিশ সনদ দেবেন এমন বিধান রয়েছে। কিন্তু তাঁর সুপারিশ না নিয়েই চেয়ারম্যান অন্তত অর্ধশত সনদ দিয়েছেন। ভুয়া ওয়ারিশ দাবি করে মামলা হচ্ছে। সে কারণে ক্ষতিপূরণও আটকে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা যা বলেন : আইনজীবী জালাল উদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘যাদের খানা নেই, ভোটার এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তাদের নামে (রাখাইন) একশ্রেণির প্রতারক টাকার মাধ্যমে চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ নিয়েছে। সেই সনদ দিয়ে মামলা করছে। আদালতের বাইরে দালালচক্রটির সঙ্গে বাধ্য হয়েই জমির মালিকরা আলোচনায় বসছেন। রফাদফা না হওয়ায় মামলার জটিলতা শেষ হচ্ছে না। ’ তিনি আরো বলেন, কলাপাড়া আর পটুয়াখালীতে এ পর্যন্ত ৫২টি মামলা হয়েছে। মাত্র চারটিতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্যগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিযোগ্য মামলা। কিন্তু নিষ্পত্তি হচ্ছে না।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবাগুলোর দাবি, জমি বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত আবুল খায়ের রিপন কিছু লোককে ভুয়া ওয়ারিশ সাজিয়ে মামলা করছে।

অভিযোগ বিষয়ে রিপন মোবাইল ফোনে বলে, সিএস, পিএস, আরএসসহ বিভিন্ন খতিয়ানে রাখাইন পরিবারগুলোর নামে অতিরিক্ত জমি রয়েছে। সর্বশেষ বিএস জরিপে সেই অতিরিক্ত জমি আবার রাখাইনদের নামে রেকর্ড হয়েছে। সেই রেকর্ডবলে তাদের ওয়ারিশরা সনদ নিয়ে জমির ক্ষতিপূরণ দাবি করছে।

এই ধরনের জমির পরিমাণ ৩০ একরের বেশি হবে না—এমন মন্তব্য করে রিপন বলে, ‘রাখাইনদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে সবাই আমাকে দুষছে। ’

পটুয়াখালী রাখাইন বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মং চো বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের জন্য মধুপাড়া, চরনিশানবাড়িয়া ও নিশানবাড়িয়া মৌজায় এক হাজার দুই একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ওই জমির মধ্যে রাখাইন সমপ্রদায়ের ২৭৫টি পরিবারের ৩৫০ একর জমি আছে। তার রেকর্ডও আছে। সেই রেকর্ড অনুযায়ী রাখাইন সমপ্রদায়ের ভূমি মালিকরা সরকারের নোটিশও পেয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ওই সব জমির মালিকানা দাবি করে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এ নিয়ে তারা মামলাও করেছে।

ধানখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ গাজী কালের কণ্ঠকে বলেন, মধুপাড়া একসময় জঙ্গল আর ছোট ছোট নালায় ভরা ছিল। জমি রাখাইনদের কাছ থেকে কেনা হলেও নালা অবিক্রীত ছিল। সেই জমির মালিকদের ওয়ারিশরা যেখানে বসবাস করে সেখান থেকে সনদ নিয়ে এসেছে। সেই সনদবলেই তিনি ওয়ারিশ সনদ দিয়েছিলেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্যের সুপারিশ প্রসঙ্গে লতিফ গাজী বলেন, যেকোনো সদস্যই সুপারিশ করতে পারেন। এ পর্যন্ত তিনি অন্তত ১২টি সার্টিফিকেট দিয়েছেন বলে দাবি করেন।

আটকে আছে পুনর্বাসন : কলাপাড়া উপজেলার সদ্য বিদায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক কুমার রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ৯৮৬ একর এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২০০ পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। মামলা জটিলতার কারণে পুনর্বাসন বন্ধ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, মামলার কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ টাকা পাচ্ছে না।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক এ কে এম শামিমুল হক সিদ্দিকীও একই কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ‘ভুয়া কিছু ওয়ারিশে মামলা হয়েছে বলে শুনেছি, সেগুলো দেখার দায়িত্ব আদালতের। আদালত থেকে মামলা নিষ্পত্তি হলেই টাকা দেওয়া হবে। একই কারণে পুনর্বাসনের কাজও শুরু করা যাচ্ছে না বলে জেলা প্রশাসক জানান। ’


মন্তব্য