kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বেনাপোল স্থলবন্দর

বারবার আগুন লাগলেও তদন্ত রিপোর্ট বেরোয় না

ফখরে আলম, যশোর   

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বারবার আগুন লাগলেও তদন্ত রিপোর্ট বেরোয় না

দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলে বারবার অগুন লাগে। পুড়ে যায় আমদানি করা শত কোটি টাকার পণ্য।

কিন্তু কোনোবার তদন্ত প্রতিবেদনই প্রকাশিত হয় না। তদন্ত প্রতিবেদন চাপা পড়ে থাকে। আমদানিকারকরা পান না কোনো ক্ষতিপূরণ। অভিযোগ আছে, কতিপয় কর্মকর্তা ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এই বন্দর ব্যবহার করে ব্যাপক সুবিধা নিলেও বন্দরের উন্নয়নে তাঁদের কোনো ভূমিকা থাকে না। এ বন্দর থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও বন্দরের উন্নয়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। বরং অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনায় অরক্ষিত থাকে বন্দর। আর এ কারণেই একের পর এক আগুন লাগার ঘটনা ঘটে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

গত রবিবার বন্দরের ২৩ নম্বর গুদামে আগুনে প্রায় ১০০ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, পণ্য রাখার নিয়মনীতি মানা হয়নি। একই গুদামে দাহ্য পদার্থের পাশাপাশি গার্মেন্ট সামগ্রী, তুলা, কাগজ, মশার কয়েল, ফাইবার, বিভিন্ন ধরনের কলকবজা রাখা ছিল। এ কারণে আগুন অল্প সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রাথমিকভাবে আগুন নেভানোর জন্য বন্দরে পানি সরবরাহের ‘হাইডেন’ সুবিধা থাকলেও আগুন লাগার সময় ওই সুবিধা কোনো কাজে লাগেনি। একজন সহকারী ফায়ার পরিদর্শক ও তিনজন ফায়ারম্যানও কর্মরত ছিলেন। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের সময় তাঁদের দেখা মেলেনি। এমনকি তাঁদের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।

এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিসের যশোরের উপপরিচালক পরিমল চন্দ্র কুণ্ডু বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো নির্ণয় করা হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনে গুদামে পণ্য রাখেনি। একই স্থানে দাহ্য পদার্থ, প্লাস্টিক, কসমেটিক সামগ্রী রাখা হয়েছে। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক আব্দুল জলিল বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো জানা সম্ভব হয়নি। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ হচ্ছে। ’ অব্যবস্থাপনা, কর্তব্যে অবহেলা সম্পর্কে তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, আগুনে ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে। তবে তিনি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বন্দর উন্নয়নে ভূমিকা না রাখার অভিযোগ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।  

জানা যায়, এর আগে ১৯৯৫ সালে ৯ ও ১০ নম্বর শেডে আগুনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৯৬ সালে ২৩ ও ২৪ নম্বর গুদামে নাশকতামূলক আগুনে ১০০ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে যায়। ২০০৫ সালে আগুনে আমদানি করা ১০০ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে যায় ১০ নম্বর শেডে। ২০০৯ সালে আরেক অগ্নিকাণ্ডে ৩৩ নম্বর শেডের সাড়ে তিন কোটি টাকার পণ্য পুড়ে যায়। কিন্তু আমাদনিকারকরা এর জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। আগুনের ওই সব ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, বন্দরে কর্মরত এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী পণ্য চুরির সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা নাশকতামূলকভাবে আগুন ধরিয়ে দিয়ে থাকতে পারেন। গত ১১ সেপ্টেম্বর আগুনে পুড়ে যাওয়া ২৩ নম্বর শেডের পাশে লাইটপোস্টে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে আগুন লাগে। স্থানীয় শ্রমিকরা আগুন নেভাতে সক্ষম হলেও সেই ত্রুটি ঠিক করা হয়নি। এ ছাড়া পণ্য নিয়ে ভারতীয় ট্রাকচালকরা গুদামে যান প্রকাশ্যে ধূমপান করতে করতে। অনেকে মনে করেন, ওই ধূমপান থেকেও আগুন লেগে থাকতে পারে।

শুল্ক কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৯৮৩ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই হাজার ৯৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে সরকার। কিন্তু বন্দরের উন্নয়নে এর সামান্য অংশও খরচ করা হয়নি। বেনাপোল বন্দর দেখভাল করে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। আর রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি তদারক করে শুল্ক কর্তৃপক্ষ। এই দুই কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। এই দুই কর্তৃপক্ষের অসৎ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য হচ্ছে বেনাপোল বন্দর থেকে লুটপাট করে টাকার পাহাড় বানানো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বন্দর ব্যবহারকারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পণ্য ছাড় করাতে ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হয়। বেনাপোলে ঘুষের নাম হচ্ছে স্পিড মানি। প্রকাশ্যেই স্পিড মানি হাতে হাতে, দালাল ও বিকাশের মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের নেতৃবৃন্দ মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। ’


মন্তব্য