kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খোকনের ‘শাসন’ চুপচাপ প্রশাসন

কাজল কায়েস, লক্ষ্মীপুর   

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



খোকনের ‘শাসন’ চুপচাপ প্রশাসন

খোকন ওরফে ‘ডাকাত খোকন’। নাম ছোট, বয়সও কম।

কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি, নারী নির্যা তন, চরের জমি দখলসহ অভিযোগের ফিরিস্তি অনেক লম্বা। চার জেলায় তাঁর অপকর্মের সঙ্গী তিন ভাইসহ ৪০ জন। সবার হাতে রয়েছে অবৈধ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে নির্যা তনের খড়্গ। খোকনের চোখরাঙানিতে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী এলাকাছাড়া। চরের জমি রক্ষায় খোকনকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ আছে সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সংসদ সদস্য বলেছেন, পুলিশই ডাকাত খোকনকে ধরছে না। আর খোকন বলছেন, ‘আমি ভালো হয়ে গেছি। আমি শুধু সরকারি জমি বিক্রি করি। ’

বাবা ইসমাইল মাঝির চার ছেলের মধ্যে খোকন দ্বিতীয়। তাঁর বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ভূঁইয়ার হাটে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে খোকন ঘাঁটি পেতেছেন লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার দুর্গম চরগজারিয়ায়। এখান থেকেই রামগতি, নোয়াখালীর হাতিয়া ও সুবর্ণচর, ভোলার মনপুরা ও তজুমদ্দিন এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার মেঘনা নদী এলাকায় অনেকটা নির্বিঘ্নে চলছে খোকনের ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অপহরণের ‘রাজত্ব’।

বিশেষ করে রামগতির চরআবদুল্লাহ ইউনিয়নে ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি, চরের জমি দখল ও বিক্রি এখন নিয়মিত ঘটনা। এসবই খোকন ও তাঁর ৪০ অনুসারী করে বলে সূত্র জানায়। সম্প্রতি খোকন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যা লয়ে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি গত ১৫ জুন রামগতি উপজেলা পরিষদের মাসিক সাধারণ ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থাপিত হয়। এরপর পেরিয়ে গেছে সাড়ে তিন মাস। কিন্তু সুফল মিলছে না। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে এসব এলাকার মানুষ।

খোকনের হুমকিতে চরআবদুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বেল্লাল হোসেনসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী এলাকাছাড়া। চেয়ারম্যান সপরিবারে থাকেন উপজেলা শহরে।

অভিযোগ রয়েছে, লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি ও কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন চরের একক আধিপত্য নিতে খোকনকে মদদ দিচ্ছেন। তিনি খোকনকে ‘হয়রানি’ না করতে রামগতি থানার ওসিকে বাসায় ডেকে নিয়ে দলীয় জ্যেষ্ঠ কয়েক নেতার সামনে সতর্ক করে দিয়েছেন। বলেছেন, তাঁকে চর রক্ষা করতে হলে খোকনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। অভিযোগ অস্বীকার করে সংসদ সদস্য বলেন, ‘ডাকাত খোকনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করছে না। খোকনের অত্যাচারে আওয়ামী লীগ-যুবলীগের অনেক নেতাকর্মী এলাকাছাড়া। খোকন কিছুদিন নীরব থাকার পর আবার অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। এ জন্য বাধ্য হয়েই তাকে ধরতে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোকনের অন্তত ৪০ জন অনুসারী রয়েছে। তারা হলো ভাই খসরু, জমির, ফখরুল ইসলাম ফখরা, অনুসারী শেখ ফরিদ ওরফে শেকু, ওয়াজ উদ্দিন, ফখরুল, মফিজ, জমির, শেখ ফরিদ, নজরুল ইসলাম, আজিম, আবদুর রব, ইউছুফ, মুরাদ, মিরাজ, ফেরদাউস, সাদ্দাম, মো. শহিদ, রিয়াজ, আবু তাহের, মতিন, মহিউদ্দিন, আজাদ, আরজু ওরফে আরজুন্নাহ, মনির, বেলাল, মাকসুদ, ছোট রিয়াজ, আবুল খায়ের, ভুট্টু, নাছির, সেলিম, মিজান, জাকের, জসিম, আলমগীর, ইব্রাহিম, হুমায়ুন প্রমুখ। তাদের দিয়েই চাঁদাবাজি, অপহরণ, নারী নির্যা তন, ডাকাতি, জমি দখল ও বিক্রি করা হয়। তাদের প্রায় প্রত্যেকের বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ভোলার বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের কাছে বিপুলসখ্যক দেশীয় অস্ত্র, অত্যাধুনিক ওয়ান শ্যুটার প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ রয়েছে। নিজেদের অবস্থান জানান দিতে প্রায়ই তারা দলবদ্ধভাবে প্রকাশ্যে চর ও নদীতে মহড়া দেয়।

চরআবদুল্লাহ ইউনিয়নবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রামগতির চরগজারিয়া, তেলির চর, ঘাষিয়ার চর, দক্ষিণ ঘাষিয়ার চর ও মেঘনার বুকে জেগে ওঠা মাঝের চরে প্রায় এক হাজার একর সরকারি জমি রয়েছে। এসব চরের বেশির ভাগই খোকন ও তাঁর অনুসারীদের দখলে। চরগুলোতে কৃষকদের গরু ও মহিষ অবাধ বিচরণ করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। টাকা নিয়ে এলাকাভিত্তিক ‘ইজারা’ দিয়েছেন খোকন। চরআবদুল্লাহর ২ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ অংশের ১০০ একর জমি ইজারা বাবদ তিন লাখ, দক্ষিণ তেলির চরের ৩০০ একর (প্রতি একর তেরো শ) জমি থেকে তিন লাখ ৯ হাজার, দক্ষিণ ঘাষিয়ার চরের আবদুল মান্নানের কাছ থেকে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছেন খোকন। চরগজারিয়া ও তেলির চরে কৃষকরা জমি চাষ করতে গেলে সাতটি পাওয়ার টিলার (ট্রাক্টর) থেকে ৭০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

রামগতি থানা সূত্র জানায়, গত ২৪ আগস্ট জেলে বাবুল ও মুরাদ মাঝি মেঘনা নদীর চরআবদুল্লাহতে মাছ ধরছিলেন। এ সময় খোকন অস্ত্রসহ ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে এসে বাবুল-মুরাদকে হাত-পা বেঁধে মালসহ নিয়ে যান। দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে পুলিশের তৎপরতায় তাঁরা মুক্তি পান। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, চরআবদুল্লাহ ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি  জসিম উদ্দিন বাবুল, সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি মিলন বেপারীসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী খোকনের হুমকিতে এলাকাছাড়া। খোকন ও তাঁর লোকজনের নির্যা তনের শিকার হয়েছেন ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিজল, যুবলীগ সভাপতি মিলন বেপারী, ইউপি সদস্য মিল্লাত হোসেন, আবদুল খালেক, আবুল হাসেম, এলাকার আবদুল হান্নান, সুমন হোসেন ও চরগজারিয়া গ্রামের শেখ ফরিদসহ অনেকে।

রামগতি থানার ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, রাজনৈতিক মদদের কারণেই খোকন চরে জমি দখল, বিক্রি ও চাঁদাবাজি করেন। ইউএনও এ এস এম শফি কামাল বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা হয়েছে। চরাঞ্চল ও নদীতে মানুষের নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযুক্ত খোকন মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমি এখন ভালো হয়ে গেছি। রামগতির এমপি সাহেব আমাকে নারী নির্যা তন না করার শর্ত দিয়ে চরে পাঠিয়েছেন। আমি কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত না। চরের সরকারি জমি বিক্রি করে লোকজনকে নিয়ে চলি। বেল্লাল চেয়ারম্যান আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছেন। আমার কারণে হাজার হাজার জেলে নদীতে ও চরে নিরাপদে থাকতে পারছে। ’ জেলা জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (সদর) জুনায়েত কাউছার বলেন,  খোকনের সদস্যদের গ্রেপ্তারে  অভিযান চলছে।

 


মন্তব্য