kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঝরছে তিস্তাচরের শিশুরা

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ঝরছে তিস্তাচরের শিশুরা

মা-বাবা চরে কাজ করছেন। শিশুটিকে দোলনা বানিয়ে রাখা হয়েছে বাঁশঝাড়ের নিচে। অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হচ্ছে চরের শিশুরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে যখন বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ পালিত হচ্ছে তখন অযত্ন-অবহেলায় মা-বাবার সান্নিধ্য ছাড়াই বেড়ে উঠছে রংপুরে তিস্তার চরের শিশুরা। ৩৮ বছর ধরে দেশে দিবসটি পালিত হয়ে এলেও এসব চরাঞ্চলের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের শিশু জরিপ অনুযায়ী তিস্তাতীরবর্তী রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় চার থেকে ১৪ বছরের শিশু রয়েছে ৭৯ হাজার ৬১১ জন। এর মধ্যে ছেলে ৪০ হাজার ৪৪৯ এবং মেয়ে ৩৯ হাজার ১৬২ জন। এলাকার ছয় থেকে ১০ বছরের বেশি ৪৫ হাজার ৭১৪ জন শিশু স্কুলে ভর্তি হলেও নানা প্রতিকূলতার কারণে প্রাথমিকের গণ্ডিই পার হতে পারে না।

সূত্র জানায়, গঙ্গাচড়ার ছোট-বড় ২৭টি চরে প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের বাস। গড়ে প্রতি পরিবারে দুজন করে শিশু থাকলে চরে মোট শিশুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০ হাজার। চরের শিশুরা দুরন্তপনার ক্ষেত্রে ঠিক থাকলেও তাদের না আছে পোশাক-পরিচ্ছদ, না আছে যত্নআত্তি, না আছে পুষ্টি। বর্তমানে চরের স্কুলগুলোতে শিশুরা শখ করে ভর্তি হলেও অভাব-অনটনের কারণে খাবার জোগাতে শেষ পর্যন্ত স্কুল ছেড়ে শ্রমে নামতে বাধ্য হচ্ছে।

গঙ্গাচড়ার বিভিন্ন চর ঘুরে শিশুদের এই অবহেলার চিত্র দেখা গেছে সর্বত্র। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পশ্চিম মহিপুর এলাকায় তিস্তা বাঁধে আশ্রিত একটি পরিবারের পাঁচ মাস বয়সের কন্যাসন্তান ঘুমাচ্ছিল বাঁশঝাড়ের নিচে দোলনার আদলে ঝোলানো ইউরিয়া সারের বস্তায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিশুকে ঘুমিয়ে রেখে মা-বাবা অন্যের কাজে গেছেন মাঠে। মা ফিরে এসে বুকের দুধ খাওয়াবেন। বাঁধে আশ্রিত হাছেন বানু নামের এক নারী বলেন, ‘হামরাতো (আমরা) এমন করিই ছাওয়া (সন্তান) মানুষ করি। নিজের ভালো খাবার জোটে না বলে ছাওয়াও ঠিকমতন দুধ পায় না। ’ চার-পাঁচ মাস বয়স থেকেই শিশুদের ভাতসহ অন্যান্য খাবার খেতে হয় বলে তিনি জানান। জয়রাম ওঝা চরের ইদ্রিস আলী বলেন, ‘ছাওয়া দুইটাক স্কুলোত দিছনু বাহে। গত আলুর মৌসুমে ওমরা (দুই সন্তান) মাইনষের ভুঁইয়োত আলু কুড়াইছে, ধানের শীষ কুড়াইছে বলেই দুই দিন খাবার পাছি। এর পর থাকি ওমরা আর স্কুলোত যায় না। ’ তিস্তার জেগে ওঠা চরে খেলছিল সাত-আটটি শিশু। তাদের মধ্যে চারজনই স্কুলে যায় না। এ প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে আলী হোসেন ও শফি মিয়া জানায়, ‘বাবার সাতে ক্ষ্যাতোত কাম করা নাগে। স্কুলোত যাই ক্যামন করি!’

লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাদী জানান, ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর তিস্তার ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়েছে চরের পরিবারগুলো। বেশির ভাগ পরিবারের প্রধান জীবন বাঁচানোর তাগিদে শ্রম বিক্রির জন্য ছুটে যায় ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায়।


মন্তব্য